মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

ইন্দ্রধনুর ইতি : এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

ইন্দ্রধনুর ইতি : এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ইন্দ্রধনু মূলত একটি বায়ুমণ্ডলীয় অপটিক্যাল ঘটনা। সূর্যের সাদা আলো বৃষ্টির ফোঁটার ভেতরে প্রবেশ করে প্রতিসরিত (refraction), প্রতিফলিত (reflection) এবং পুনরায় প্রতিসরিত হয়ে নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত হয়। এর ফলে আকাশে লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, জ্যামুনি ইত্যাদি রঙের ধনুকাকৃতি রেখা দৃশ্যমান হয়। ইন্দ্রধনু দেখা পাওয়ার জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত প্রয়োজন—

  • বাতাসে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বা বৃষ্টির ফোঁটা থাকা,
  • সূর্যের আলো নির্দিষ্ট কোণে পড়া,
  • আকাশের একটি অংশে পরিষ্কার দিগন্ত থাকা।

কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ইন্দ্রধনু দেখার সুযোগ ক্রমশ কমে আসবে, বিশেষত ভারতবর্ষের মতো উপমহাদেশীয় অঞ্চলে। এর বৈজ্ঞানিক কারণগুলি নিম্নরূপ—

১. বৃষ্টিপাতের ধরণ পরিবর্তন
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে জলবায়ুর স্বাভাবিক চক্র ভেঙে যাচ্ছে। যেখানে আগে নিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টি হতো, সেখানে এখন খরা বা অতি বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। নিয়মিত ও মৃদু বৃষ্টি না থাকলে আকাশে সমানভাবে ভাসমান বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি হয় না। ফলে ইন্দ্রধনু গঠনের সুযোগ কমে যায়।

২. বায়ুদূষণ ও কণার আধিক্য
শিল্পায়ন, যানবাহন ও জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বাতাসে কার্বন কণা, ধুলো, অ্যারোসোলের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এই কণাগুলি সূর্যের আলোকে ছত্রভঙ্গ করে (scattering effect) দেয়। আলো সঠিকভাবে প্রতিসরিত না হলে ইন্দ্রধনুর রঙগুলি ফিকে হয়ে যায় বা একেবারেই দৃশ্যমান হয় না।

৩. মেঘগঠনের পরিবর্তন
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মেঘের ঘনত্ব ও গঠনেও পরিবর্তন আসছে। বেশি ঘন মেঘ সূর্যের আলোকে বাধা দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে বৃষ্টির পরিবর্তে অতি ক্ষুদ্র ফোঁটা (drizzle) বা কৃত্রিম কুয়াশা তৈরি হয়, যা ইন্দ্রধনুর জন্য উপযুক্ত নয়।

৪. জলের ঘাটতি ও স্থানীয় জলচক্রের ভাঙন
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাবে নদী, হ্রদ, পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে স্থানীয় জলীয় বাষ্পের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টির মৌসুমি প্যাটার্ন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ছে, যা ইন্দ্রধনুর অস্তিত্বের পক্ষে অনুকূল নয়।

৫. জলবায়ুর আঞ্চলিক বৈষম্য
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর কিছু শীতল অঞ্চলে ভবিষ্যতে হয়তো ইন্দ্রধনুর দেখা বাড়বে। কিন্তু ভারত, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার মতো গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে ক্রমশ কমে যাবে। কারণ এখানে বৃষ্টিপাতের বৈচিত্র্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং গ্রীষ্মকালে আকাশ অনেকাংশেই অতিরিক্ত মেঘলা থাকে।

ইন্দ্রধনু নিছক একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়; এটি জলবায়ুর ভারসাম্যের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বলা যায়, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও সূর্যালোকের স্বাভাবিক মেলবন্ধন নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে ভারতের মতো অঞ্চলে ইন্দ্রধনু আর দেখা নাও যেতে পারে। এই পরিবর্তনের দায়ভার মানুষের ওপরই বর্তায়, কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় এবং শিল্পায়নই মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়াচ্ছে। তাই ইন্দ্রধনুর মতো প্রাকৃতিক বিস্ময়কে টিকিয়ে রাখতে হলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, বনভূমি সংরক্ষণ ও পরিবেশ-বান্ধব জীবনযাপন এখন জরুরি।


দৈএনকে/জে .আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ