যে নারী মৃতদেহের রক্ত দিয়ে কেক আর চর্বি গলিয়ে বানাতেন সাবান

রাতটা ছিল ঘন কুয়াশায় মোড়া। ইতালির ছোট্ট শহর করেজ্জিও— শান্ত, স্থির, অথচ অদ্ভুত এক ভয়ের ছায়ায় ঢাকা। শহরের মাঝখানে একটা ভাঙাচোরা পুরনো বাড়ি। সেখানেই থাকতেন এক মহিলা, যার নাম ছিলেন "লিওনার্দা সিয়ানসিউলি"। তিনি ১৮৯৪ সালে জন্মেছিলেন। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একজন নারী। হাসিখুশি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিষ্টি ব্যবহার, কেক বানিয়ে খাওয়ানো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তিনি হয়ে উঠছিলেন রক্তের পিপাসায় তাড়িত এক দানবী।
ছোটবেলা থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর জীবনে অভিশাপ লেগে আছে। মা তাঁকে জন্মের সময় অভিশাপ দিয়েছিলেন, আর সেই ভয়ই ধীরে ধীরে তাঁর রক্তে গেঁথে গিয়েছিল। জীবনে একের পর এক সন্তান হারাতে হারাতে তিনি প্রায় উন্মাদ হয়ে পড়েছিলেন। সতেরো বার সন্তানধারণ করেছিলেন, কিন্তু তেরোজনকে হারিয়েছিলেন রোগ আর দুর্ঘটনায়। মাত্র চারজন সন্তান জীবিত ছিল, আর তাঁদের ভেতরে সবচেয়ে প্রিয় ছিল তাঁর ছেলে জিউসেপ্পে।
১৯৩৯ সালের শেষদিকে খবর এলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইতালি যুদ্ধের ময়দানে সৈন্য পাঠাচ্ছে। লিওনার্দার প্রিয় ছেলে জিউসেপ্পেকেও যুদ্ধে যেতে হবে। সেই খবর শুনেই তিনি ভেঙে পড়লেন। বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন— আমি আর কাউকে হারাতে পারবো না। ও যদি যুদ্ধে মরে যায়, তবে আমার জীবনটাই শেষ। তাঁর মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল এক ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। এক জ্যোতিষী তাঁকে বলেছিল— তুমি কারাগারে শেষ করবে, তোমার জীবনে রক্ত ঝরবে। আরেক ভবিষ্যদ্বাণীতে শোনা গিয়েছিল— তুমি যদি কারও জীবন দাও, তবে তোমার ছেলের জীবন রক্ষা পাবে।
এভাবেই তাঁর মনে জন্ম নিল এক ভয়ংকর বিশ্বাস, অন্যের রক্ত আর মাংস উৎসর্গ করলে তাঁর ছেলেকে মৃত্যু থেকে বাঁচানো যাবে।
১৯৪০ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি ছিল সেই অন্ধকার দিনের শুরু। "ফস্টিনা সেট্টি" নামের এক অবিবাহিতা মহিলা লিওনার্দার কাছে এলো। বিয়ের জন্য অনেকদিন ধরে চেষ্টা করছিলেন ফস্টিনা, কিন্তু কোনোভাবে পাত্র মিলছিল না। লিওনার্দা তাঁকে বলল— আমি তোমার জন্য এক ধনী স্বামী ঠিক করেছি, তবে কাউকে কিছু বলবি না। কৌশলে তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিল বিদায়ী চিঠি, যেন কেউ সন্দেহ না করে। তারপর বাড়ির ভেতরে মদের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন ঘুমের ওষুধ। ফস্টিনা যখন অচেতন হয়ে পড়লেন, লিওনার্দা কুঠার দিয়ে এক আঘাতে তাঁর মাথা গুঁড়িয়ে দিলেন। সেই রাতেই তিনি দেহটাকে টু'করো টু'করো করে বড় পাত্রে কস্টিক সোডার মধ্যে ফেলে দিলেন। মাংস-হাড় সব গলে ঘোলাটে তরলে পরিণত হলো। শুধু রক্ত আলাদা করে জমালেন, ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে বানালেন মিষ্টি কেক। পরের দিন প্রতিবেশীরা এসে সেই কেক খেয়েছিল হাসিমুখে— কেউ জানত না সেখানে ফস্টিনার রক্ত মিশে আছে।
এর কিছুদিন পর, ১৯৪০ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর, লিওনার্দা টার্গেট করলেন ফ্রান্সেসকা সোয়াভি নামের আরেক মহিলাকে। এবার তিনি বললেন— তোমার জন্য বিদেশে শিক্ষকতার চাকরি ঠিক করেছি। তুই ভাগ্যবতী। আগের মতোই তাঁকে দিয়েও লিখিয়ে নিলেন বিদায়ী চিঠি। তারপর নেশার পানীয়, কুঠারের আঘাত, আর ভয়াবহ টু'করো টু'করো করা। সেই দেহও গেল কস্টিক সোডার পাত্রে। তাঁর র'ক্ত দিয়েও বানালেন কেক। লিওনার্দা মনের ভেতরে ফিসফিস করে বললেন— আরেকটা আত্মা উৎসর্গ করলাম। এবার আমার ছেলে বাঁচবে।
কিন্তু তাঁর তৃষ্ণা থামল না...
১৯৪০ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর, অপেরা গায়িকা 'ভার্জিনিয়া কাসিয়োপ্পো' এসে পড়লেন লিওনার্দার ফাঁদে। ভার্জিনিয়া একসময় নামকরা শিল্পী ছিলেন, কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল। লিওনার্দা তাঁকে প্রলোভন দিলেন— তোমাকে ফ্লোরেন্সে বড় দলের সঙ্গে গান গাওয়ার সুযোগ এনে দেব। সেদিন বিকেলে ভার্জিনিয়া তাঁর ঘরে পা রাখতেই ফাঁদে আটকা পড়লেন। আবারও একই কায়দা— বিদায়ী চিঠি, নেশা, আর কুঠারের নির্মম আঘাত। কিন্তু এইবার লিওনার্দা এখানেই থামলেন না। ভার্জিনিয়ার দেহ থেকে আলাদা করে চর্বি সংগ্রহ করলেন। সেই চর্বি গলিয়ে বানালেন সাবান। সাবান তিনি হাসিমুখে প্রতিবেশীদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন— এটা খুব ভালো, শরীর পরিষ্কার রাখে। আর তাঁর র'ক্ত দিয়ে তৈরি করলেন মিষ্টি কেক।
তিনজন নারী— ফস্টিনা, ফ্রান্সেসকা আর ভার্জিনিয়া! সবাই হারিয়ে গেল লিওনার্দার পাত্রে, সাবানে আর কেকের ভেতরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোপন চাপা থাকল না। ভার্জিনিয়ার আত্মীয়রা তাঁর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। পুলিশ তদন্ত শুরু করল, এবং সূত্র গিয়ে থামল লিওনার্দার বাড়ির সামনে।
পুলিশ যখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করল, প্রথমে তিনি চুপ ছিলেন। কিন্তু যখন শুনলেন তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হবে, তখন লিওনার্দা হাহাকার করে উঠলেন— না! ও নির্দোষ! সব করেছি আমি... আমি করেছি। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি নিঃসংকোচে বর্ণনা দিলেন প্রতিটি খুনের, একেবারে শীতল গলায়। তাঁর মুখে তখন অদ্ভুত এক হাসি। তিনি বলেছিলেন— ওই মহিলারা সত্যিই মিষ্টি ছিলেন। তাঁদের রক্ত দিয়ে কেক খুবই সুস্বাদু হয়েছিল।
১৯৪৬ সালে আদালত তাঁকে ৩০ বছরের জেল আর তিন বছরের মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে কাটানোর সাজা দেয়। শেষমেশ ১৯৭০ সালে কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হয়।
আজও রোমের অপরাধ জাদুঘরে পড়ে আছে তাঁর সেই বড় লোহা পাত্র, কুঠার আর সাবান। মানুষ যখন এগুলো দেখে, তখন গা শিউরে ওঠে। কারণ লিওনার্দা শুধু এক খু/নি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অন্ধ মাতৃত্ব আর কুসংস্কারে ভর করা ভয়ংকর দানব, যিনি নিজের ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মানুষের মাংসকে কেক আর সাবানে পরিণত করেছিলেন।
দৈএনকে/ জে. আ