সংগ্রামের পথ পেরিয়ে বলিউডে ‘ম্যাজিক’ মনোজ বাজপেয়ী

বর্তমান ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অভিনেতার নাম মনোজ বাজপেয়ী। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে যে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি) তাঁকে তিন তিন বার ফিরিয়ে দিয়েছিল, আজ তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের গর্ব। বিহারের এক কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে বলিউডের সিংহাসন জয় করা এই অভিনেতার জীবন যেকোনো সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। গ্যাংস্টার, পুলিশ থেকে শুরু করে সমকামী অধ্যাপক—প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
শূন্য থেকে শিখরে: এক কৃষকের ছেলের লড়াই
১৯৬৯ সালের ২৩ এপ্রিল বিহারের নারকাতিয়াগঞ্জে জন্ম মনোজের। বাবা কৃষক হওয়ায় পাঁচ ভাই-বোনের সাথে শৈশবে তাঁকেও মাঠে কাজ করতে হয়েছে। বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হবে, কিন্তু প্রিয় অভিনেতা মনোজ কুমারের নাম অনুসারে রাখা নামটিই হয়তো তাঁর ভবিতব্য ঠিক করে দিয়েছিল। স্কুল জীবনে অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির হলেও শিক্ষকদের জোরাজুরিতে করা কবিতা আবৃত্তিই পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।
দিল্লী ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থিয়েটারে জড়িয়ে পড়া মনোজ যখন এনএসডিতে সুযোগ পেলেন না, তখন ভেঙে না পড়ে শামদেব গ্রুপ থিয়েটারে ওয়ার্কশপ করেন। ভাগ্যের পরিহাসে যে প্রতিষ্ঠানে ছাত্র হিসেবে ঢুকতে চেয়েছিলেন, সেখানেই পরবর্তীতে শিক্ষকমণ্ডলীর একজন হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পান তিনি।
‘ভিখু মহাত্রে’ থেকে ‘সরদার খান’: অমর সব চরিত্র
শেখর কাপুরের ‘ব্যান্ডিট কুইন’ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও মনোজ বাজপেয়ীর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় রামগোপাল ভার্মার ‘সত্য’। এই ছবির ‘ভিখু মহাত্রে’ চরিত্রটি তাঁকে এনে দেয় প্রথম জাতীয় পুরস্কার। এরপর অনুরাগ কশ্যপের ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এ ‘সরদার খান’ চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের মাঝে কিংবদন্তি হয়ে আছে। এছাড়া ‘আলিগড়’ সিনেমায় একজন বিতর্কিত সমকামী অধ্যাপকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের মতে বিশ্বমানের।
খলনায়ক ও কেন্দ্রীয় চরিত্রে ভিন্নমাত্রা
প্রকাশ ঝা’র ‘রাজনীতি’ কিংবা যশ চোপড়ার ‘বীর জারা’—খল চরিত্রেও মনোজ দেখিয়েছেন তাঁর মুন্সিয়ানা। ‘পিঞ্জর’ ছবিতে দেশভাগের শিকার হওয়া যুবকের চরিত্রে অভিনয় করে পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারের বিশেষ জুরি সম্মান। সাম্প্রতিক সময়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ সিরিজের শ্রীকান্ত তিওয়ারি চরিত্রটি তাঁকে একবিংশ শতাব্দীর দর্শকদের কাছে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ‘ইন্সপেক্টর ঝেন্ডে’ পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি কাজই যেন অভিনয়ের একেকটি পাঠ্যবই।
আক্ষেপ ছাপিয়ে জয়গান
যিনি একসময় ১২০০ টাকার চাকরিতে জীবন শুরু করেছিলেন, আজ তিনি তিনবার জাতীয় পুরস্কার এবং অসংখ্য ফিল্মফেয়ার জয়ী এক মহাতারকা। মনোজ বাজপেয়ী প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের প্রতিভা আর অধ্যাবসায় থাকলে এনএসডির প্রত্যাখ্যান কিংবা বলিউডের স্বজনপ্রীতি—কোনো কিছুই সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না।