ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল স্ক্রল? মস্তিষ্কে পড়তে পারে মারাত্মক প্রভাব

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে অল্প বয়সেই যদি ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, তা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর একটি বড় কারণ হতে পারে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস।
বিশেষ করে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল স্ক্রল করেন। প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই হাতে তুলে নেওয়া হয় স্মার্টফোন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অভ্যাস ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা এবং একটানা স্ক্রল করার ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে। এতে মনোযোগ কমে যাওয়া, চিন্তায় বিভ্রান্তি তৈরি হওয়া এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই অভ্যাসের কারণে কম বয়সেই ‘ব্রেন ফগ’ বা মানসিক অস্পষ্টতা দেখা দিতে পারে। ফলে দৈনন্দিন কাজকর্মে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং চিন্তাভাবনাও এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।
তাই সুস্থ মস্তিষ্ক ও ভালো স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল দেখা কেন বিপজ্জনক?
ঘুমের প্রধান কাজ হল হোমিয়োস্ট্যাসিস। অর্থাৎ ঘুমের সময়ে শরীর শুধু বিশ্রামেই থাকে না, পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে। ঘুমের সময়ে মস্তিষ্কের কিছু অংশ জাগ্রত থাকে, যা শরীরের ঘড়িকে চালনা করে। ঘুমোনোর সময়ে মস্তিষ্কের যে দু’টি অংশ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে তা হল –‘হাইপোথ্যালামাস’ ও ‘ব্রেন স্টেম’। এই দুই অংশের স্নায়ুকোষই সঙ্কেত আদানপ্রদানের কাজটা করে। ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যদি মোবাইলের পর্দায় টানা চোখ রাখেন কেউ, তা হলে মোবাইল থেকে বেরোনো নীল আলো মস্তিষ্কের ওই স্নায়ুকোষকে অধিক উত্তেজিত করে তোলে। ফলে স্নায়বিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। অধিক পরিমাণে ডোপামিনের ক্ষরণ হতে শুরু করে। ফলে যেমন মানসিক অস্থিরতা বাড়ে, তেমনই মস্তিষ্কের ভিতরেও প্রদাহ শুরু হয়। যে কারণে সারা দিন মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকতে পারে, মাথাযন্ত্রণা বা মাইগ্রেন হতে পারে এবং অত্যধিক দুশ্চিন্তা গ্রাস করতে পারে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরেই গবেষণা করছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, সকালে তো বটেই সারা দিনে বেশি ক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকেন যাঁরা, তাঁদের মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশটি কাজ করা কমিয়ে দেয়। এর ফলেই দেখা দেয় ব্রেন ফগের সমস্যা। এতে ভাবনাচিন্তা গুলিয়ে যায়, সিন্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়। সামান্য কারণেই উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে।
সমস্যা আরও হয়। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, মস্তিষ্কের মধ্যে কয়েক লক্ষ কোটি স্নায়ুকোষের (নিউরন) আদানপ্রদানের মাধ্যমে স্মৃতি তৈরি হয়। যে কোনও কোষের মতো, স্নায়ুকোষও তৈরি হয় প্রোটিন দিয়ে। যখন এই কোষগুলির প্রোটিন ভাঙতে থাকে, তখন তাদের দ্বারা নির্মিত স্মৃতিও টালমাটাল হয়ে যায়। মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অংশে এমন অদলবদল হয় যে, স্মৃতির পাতাই ধূসর হতে থাকে। হিপ্পোক্যাম্পাস হল মস্তিষ্কের সেই কুঠুরি, যেখানে স্মৃতি জমা থাকে। ওই অংশের সঙ্গেই যুক্ত থাকে ‘এনটোরিনাল কর্টেক্স’ নামে আর একটি অংশ। স্মৃতি জমিয়ে রাখা, স্থান-কালের পরিচয়, সময়ের হিসেব ওই অংশই নিয়ন্ত্রণ করে। ডিজিটাল পর্দায় বেশি চোখ রাখলে ও একই সময়ে স্ক্রল করে নানা জিনিস দেখতে থাকলে মস্তিষ্ক কোনও একটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারে না। যে কারণে হিপ্পোক্যাম্পাস অংশটির কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। ফলে স্মৃতিশক্তিও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
গবেষণায় এমনও দেখা গিয়েছে, যাঁরা টানা ৩-৪ ঘণ্টা মোবাইলে ভিডিয়ো দেখে বা সমাজমাধ্যমের পাতায় স্ক্রল করে কাটান, তাঁদের হৃদ্রোগ ও হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বেশি। যাঁরা ৪ ঘণ্টারও বেশি মোবাইলের ‘রিল’ দেখতেই থাকেন, তাঁদের ভবিষ্যতে হার্টের রোগ হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যাবে।