বিতর্কিত শরীফ জহির এবার বিমান বাংলাদেশের পরিচালক!

মানি লন্ডারিং, পানামা পেপারসে নাম থাকা, শত কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং সাধারণ মানুষের জমি দখলের মতো অসংখ্য গুরুতর অভিযোগে বিদ্ধ অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জহির। দেশজুড়ে যখন তার দুর্নীতির ফাইল নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদক অনুসন্ধান চালাচ্ছে, ঠিক তখনই তাকে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড-এর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল ২৫ এপ্রিল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিমান শাখা-১ এর সিনিয়র সহকারী সচিব মোছাঃ শাকিলা পারভীন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা হয়। একজন অর্থপাচারকারী এবং ব্যাংক জালিয়াতির মামলার আসামিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় দেশের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
সিআইডির জালে অর্থপাচারের তথ্য
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) শরীফ জহিরের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচারের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানে নেমেছে। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট ও অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট থেকে তাকে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, তার ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে জালিয়াতি, প্রতারণা ও বিদেশে অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক অভিযোগ রয়েছে। সিআইডি তার এবং তার পরিবারের (স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন ও শ্বশুর-শাশুড়ি) ১০ বছরের ট্যাক্স ফাইল, দেশি-বিদেশি পাসপোর্টের কপি এবং বিদেশে কেনা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির নথিপত্র চেয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, শরীফ জহির এই তদন্তে নথিপত্র সরবরাহ না করে অসহযোগিতা করার চেষ্টা করছেন।
বিশ্বজুড়ে আলোচিত পানামা পেপারস ও শরীফ জহির
২০১৬ সালে ফাঁস হওয়া বিশ্বখ্যাত 'পানামা পেপারস' কেলেঙ্কারিতে অর্থপাচারকারী হিসেবে শরীফ জহিরের নাম আসে। ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএফআইইউ (BFIU) হাইকোর্টে যে ৬৯ জন পাচারকারীর তালিকা জমা দেয়, সেই তালিকার ১৬ নম্বরে নাম রয়েছে শরীফ জহিরের। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে বিদেশে সাম্রাজ্য গড়েছেন।
ব্যাংক জালিয়াতি ও ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলা
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) জুবিলি রোড শাখা থেকে 'ক্রিসেন্ট ট্রেডার্স' নামে একটি অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে ভুয়া ঋণের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক মামলা দায়ের করেছে। এই মামলার অন্যতম আসামী শরীফ জহির। এছাড়া সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রীর সাথে মিলে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা থেকে শত শত কোটি টাকা বেনামে বের করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, শরীফ জহির ও তার চক্রটি ব্যাংকটিকে দেউলিয়া করার পথে নিয়ে গেছে।
বন্ড সুবিধায় ১০৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি
অনন্ত গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান 'অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি লিমিটেড'-এর বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে সরকারের ১০৩ কোটি ৬৯ লাখ ৬৬ হাজার ৩২৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। ২০১৯ সালে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পণ্য বিদেশে রফতানি না করে খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউসের সাথে সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে চতুর এই ব্যবসায়ী সেই সময় শাস্তি এড়িয়ে যান।
জমি দখল ও ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ
শরীফ জহিরের বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক দুর্নীতিই নয়, পেশিশক্তি ব্যবহার করে জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগী আক্তার হোসেন ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে অভিযোগ করেছেন যে, শরীফ জহির ও তার ক্যাডার বাহিনী তার কোটি কোটি টাকার জমি দখল করে নিয়েছে। জমিতে কাজ করতে গেলে তাকে সপরিবারে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তার প্রতিষ্ঠিত 'অনন্ত টেরেসেস' কোম্পানির নির্মাণ কাজ গায়ের জোরে চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও বর্তমানে তদন্তাধীন।
শ্রমিক নির্যাতন ও মানবিক বিপর্যয়
২০১৯ সালে আদমজী ইপিজেডে অনন্ত গ্রুপের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বকেয়া বেতন না দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের ওপর পুলিশি নির্যাতন চালানো এবং অন্তত ১৫০ জন শ্রমিককে বিনা নোটিশে ছাঁটাই করার অভিযোগ রয়েছে। নির্যাতিত শ্রমিকরা সে সময় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করলেও শরীফ জহিরের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো বিচার পাননি।
এনবিআর কর্তৃক ব্যাংক হিসাব জব্দ
সাম্প্রতিক সময়ে কর ফাঁকি সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শরীফ জহির, তার ভাই আসিফ জহির এবং তাদের মা কামরুন নাহারের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে। এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল থেকে ব্যাংকগুলোকে পাঠানো চিঠিতে তাদের ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ও ভল্ট লকারসহ সব ধরনের লেনদেন স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে।
অনেকেই মনে করেন, বিগত আওয়ামী সরকারের সময় শেখ হাসিনা, আহমেদ কায়কাউস ও জুনাইদ আহমেদ পলকের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক রাখা এই শরীফ জহির এখন ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের লোক সাজার চেষ্টা করছেন। একজন পলাতক আসামী এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটকারীকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিয়োগ দেওয়া জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী। সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই নিয়োগ বাতিল করে তাকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে।