শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

বিটিভির আধুনিকায়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

বিটিভির আধুনিকায়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ঘিরে গত প্রায় এক দশকের বিভিন্ন প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক পর্যায়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে যোগসাজশে কয়েকটি প্রকল্পে অর্থ বণ্টন ও অনিয়মের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক নিয়ম উপেক্ষা করে প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলামকে সিনিয়র প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল রয়েছে।

এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবে ১৬ এপ্রিল দুদকের উপসহকারী পরিচালক তাছলীমা আক্তারের সই করা চিঠি বিটিভি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি ও ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। অনুসন্ধানকারীরা প্রকল্প ব্যয়, ক্রয় প্রক্রিয়া ও টেন্ডার সংক্রান্ত নথি যাচাই করছেন।

যাদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে, তারা হলেন—সিনিয়র প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. মান্নাফ হোসেন, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার মো. আরিফুল হাসান এবং রক্ষণ প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল হাদী। তাদের গত সাত বছরের বিদেশ সফরের তালিকা, সফরের উদ্দেশ্য ও অনুমোদনের নথিও চাওয়া হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে প্রায় ১৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বেলজিয়ামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্টুডিওওয়াচকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও তার ভাই রাসেল মাহমুদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।

এছাড়া বিটিভির টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচারকে এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের জন্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পও তদন্তাধীন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামের সুপারিশে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়, যদিও সে সময় দেশের বড় অংশ এনালগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এতে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উদ্যোগের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।

বিটিভির ১৪টি উপকেন্দ্রে ২৫০ কেভিএ সাব-স্টেশন স্থাপন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দরপত্রে দুটি সচল সাব-স্টেশনের কথা থাকলেও বাস্তবে পুরোনো অবকাঠামোর সঙ্গে নতুন যন্ত্রাংশ যুক্ত করে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়। নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিটিভির অধিকাংশ টেন্ডার একটি নির্দিষ্ট চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়ার মতো অভিযোগও অনুসন্ধানে এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বিটিভিতে স্থায়ী প্রধান প্রকৌশলী না থাকায় বেতার থেকে প্রেষণে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যোগদানের পর থেকেই মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করত এবং নির্ধারিত ঠিকাদারকে কাজ না দিলে চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের কেন্দ্রীয় সম্প্রচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন প্রকল্পের প্রথম ধাপে একনেকে ১১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পের আওতায় এমসিআর, সিএআর, ইনগেস্ট রুম, এমএএম সিস্টেম, অটোমেটেড ভিডিও সার্ভার এবং নিউজ স্টুডিও আধুনিকায়নের কথা থাকলেও মানসম্মত যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি বলে সন্দেহ করছে দুদক।

এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বিটিভিতে ভাঙচুরের ঘটনাও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ওই ঘটনার আড়ালে পূর্বের অনিয়ম বা ত্রুটি আড়াল করা হয়েছে কিনা।

দুদকের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও আর্থিক দলিল সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হবে। প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুদকের চিঠিতে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের রাজস্ব খাতে ক্রয় করা মালপত্রের বিস্তারিত তথ্য, বিল-ভাউচার, স্টক রেজিস্টার, বিতরণ রেজিস্টার এবং ক্রয় অনুমোদনের নথি চাওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা হচ্ছে, রাজস্ব খাতের কেনাকাটা প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখানো হয়েছে কিনা।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন