মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj
দুর্নীতির পাহাড় ও সিন্ডিকেট রাজ্যের নেপথ্যে পর্ব-১

গণপূর্তের ‘মাফিয়া ডন’ শহীদুল আলমকে ঘিরে প্রাইজ পোস্টিং

গণপূর্তের ‘মাফিয়া ডন’ শহীদুল আলমকে ঘিরে প্রাইজ পোস্টিং
ছবি : সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গণপূর্ত অধিদফতরে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সিন্ডিকেট এখনও প্রবলভাবে সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে আলোচিত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সরকারি ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ভোল পাল্টে তিনি এখন বর্তমান প্রশাসনকেও বিভ্রান্ত করে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বাগিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জনরোষ ও বিতর্কিত বদলি আদেশ
২০২৪-এর জুলাই গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে যার বিরুদ্ধে মানববন্ধন হয়েছে, সেই শহীদুল আলম বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য উইং-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। গত ৪ ডিসেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে (স্মারক নম্বর: ২৫.০০.০০০০.১৩০.১২.০০১.২০১১-১০৫) তাকে প্রেষণ থেকে ফিরিয়ে এনে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। অথচ পল্টন থানায় দায়েরকৃত ৮৭৮ নম্বর মামলার আসামি হিসেবে গত ১৮ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সচেতন ছাত্র-জনতা তার ফাঁসি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, জনরোষ এড়াতে তাকে নামমাত্র ৫৬০ মডেল মসজিদ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হলেও ৯ মাস পরেই তাকে আবার ঢাকার মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্যের মহোৎসব ও ওএসডি নাটক
শহীদুল আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো নিয়োগ জালিয়াতি। ২০২৩ সালের মে মাসে ১৮ থেকে ২০তম গ্রেডের ১৬৯টি পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার পর তিনি রেজাল্টের ১৫টি সিলগালা করা খাম গায়েব করে দেন। এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে তিনি প্রায় আড়াই কোটি টাকা মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের জন্য ঢালেন বলে জানা গেছে। শাহবাগ থানায় এই নিয়ে জিডিও করা হয়। তৎকালীন মন্ত্রী উবায়দুল মুক্তাদিরের ঘনিষ্ঠ এই কর্মকর্তা প্রতিটি নিয়োগের জন্য ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছেন এবং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ শেখ সেলিমের বনানীর বাসভবন হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে বলে সূত্র দাবি করেছে।

ইজিপি পোর্টালে দুর্নীতির নজির (ওটিএম জালিয়াতি)
শহীদুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শেরে বাংলা নগর-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান (বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা) এবং শহীদুল আলম মিলে রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে ওটিএম-এর (OTM) মহোৎসব চালিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী ওটিএম ২০% হওয়ার কথা থাকলেও তারা শতভাগ ওটিএম করেছেন।
নিচে উল্লেখিত ইজিপি দরপত্র আইডিগুলো এই দুর্নীতির সাক্ষ্য দেয়: ৯২২৪৪৩, ৯২২৪৩৪, ৯৯৯৪৩৯, ৯২২৪৪০, ৯২২৪১৮, ৯২২৪৩০, ৯২৫১০৬, ৯২২৪৪১, ৯২২৪৩১, ৯২২৪৩৭, ৯২২৪৩৮, ৯২২৪৩৬, ৯২২৪৪৭, ৯২৫১০৯, ৯২২৪৩২, ৯২২৪২৯, ৯২২৪২৩, ৯২২৪২৪, ৯২২৪২৫, ৯২২৪২৬, ৯২২৪২৭, ৯২২৪২৮, ৯২২৪১৯, ৯২২৪২০, ৯২২৪২১, ৯২২৪২২, ৯২২৪১৭, ৯২২৪১৪, ৯২২৪১৫, ৯২২৪১৬, ৯২২৪১০, ৯২২৪১২, ৯২২৪১৩, ৯২২৪০৭, ৯২২৪০৮, ৯২২৩৯৯, ৯১৭৯৪৫, ৯১৭৯৩০, ৯১৭৯৮১, ৯১৭৯৪৭, ৯১৭৩২৪, ৯১৭৯৩১, ৯১৭৯৩৫, ৯১৭৯৩৯, ৯২০০৪৫, ৯১৭৯৪৪, ৯১৭৯৪৯, ৯১৭৯৫০, ৯১৭৯৪৬, ৯১৭৯৪১, ৯১৭৯৬৫, ৯১৭৯৬৬, ৯১৭৯৬৭, ৯৪৮১৭৩, ৯৪৮১৭৫, ৯৪৪৪beg, ৯৪১৩৬৮, ৯৪১৩৪৭, ৯৪১৩৪৬, ৯৪১২০৫, ৯৪১১৮৪, ৯৪৩৯০৩, ৯৪৪৪৬০, ৯৪৪৪৬২, ৯৪৪৪৬১, ৯৪৪৪৫৮, ৯৪১৩৭৯, ৯৪১৩৭৩, ৯৪১৩৬৪, ৯৪১৩৪২, ৯৪১২০১, ৯৪১১৯৯, ৯৪১৩৭৫, ৯৪১১৯৬, ৯৪১৩৮৯, ৯৪১৩৮২, ৯৪১১৯৩, ৯৪১৩৯১, ৯৪৩৯২২, ৯৪১১৮০, ৯৪১১৭৬, ৯৪৩৯১২, ৯৪১১৭০, ৯৪১৩৯২, ৯৪১৩৯৩, ৯৪৩৯১০, ৯৪৩৯১১, ৯৪৩৮৮৯, ৯৪১৩৯৪, ৯৪১৩৯৫, ৯৪১৩৯৬, ৯৪১৩৯৭, ৯৪১৩৯৮, ৯৪১১৮১, ৯৪০২৯১, ৯৪১৫৪১, ৯৪২৮১৭, ৯৪৪৪৪২, ৯৪৪৪৫৩, ৯৪৪৪৫৬, ৯৪৪৪৫৫, ৯৪৪৪৫৯, ৯৪৪৪৬৭, ৯৪১০২৩ এবং ৯৪০৯৬৬।

পাচারকৃত অর্থ ও বৈদশিক সম্পদ
শহীদুল আলম ক্ষমতার অপব্যবহার করে এক বছরে সাত বার বিদেশ সফর করেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে দুবাই আন্তর্জাতিক এক্সপোতে গিয়ে তিনি সেখানে ব্যক্তিগত ভিলা কিনেছেন এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ ও আজিজ পরিবারের সাথে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করানোর নামে ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছেন, যার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভোল পাল্টে ‘জিন্নাহ টুপি’ ও প্রতি-বিপ্লবের ষড়যন্ত্র
৫ আগস্টের পর শহীদুল আলম তার খোলস পাল্টে ফেলেছেন। মুজিব কোট ছেড়ে এখন জিন্নাহ টুপি পরে বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন। তার আসল উদ্দেশ্য হলো প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার দখল করা এবং তার অনুগত ছাত্রলীগ ক্যাডার কর্মকর্তাদের (সানাউল্লাহ, মইনুল, মাসুদ রানা, আজমুল হক মুন) গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এখনও তার বিশাল অর্থভাণ্ডার ব্যবহার করে অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

যেখানে দুর্নীতির দায়ে অনেক কর্মকর্তাকে বিদায় করা হয়েছে, সেখানে শহীদুল আলমের মতো ‘দাগী’ কর্মকর্তা কীভাবে বারবার দায়মুক্তি পাচ্ছেন, তা নিয়ে খোদ জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ। 

এদিকে ‍শহীদুল আলমকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন