বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

আইটেম সং ইতিহাসে অমর নাম হেলেন

আইটেম সং ইতিহাসে অমর নাম হেলেন
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যারা কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় না করেও সিনেমার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিলেন। ৬০ কিংবা ৭০-এর দশকের বলিউড মানেই ছিল পর্দার এক কোণে রহস্যময়ী হাসি আর জাদুকরী নাচের সেই নারী—হেলেন। যাকে ছাড়া তৎকালীন বাণিজ্যিক সিনেমার সাফল্য কল্পনাও করা যেত না। আজীবন পার্শ্ব-অভিনেত্রী বা আইটেম ড্যান্সার হিসেবে পরিচিতি পেলেও, ২০০৯ সালে যখন ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ প্রদান করে, তখন বিশ্ব আরও একবার বুঝেছিল হেলেন আসলে কোন মানের শিল্পী ছিলেন।

ইয়াঙ্গুন থেকে মুম্বাই: এক বিভীষিকাময় যাত্রা

হেলেন জেইরাগ রিচার্ডসন—পুরো নামটা বলে দেয় তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয় ছিলেন না। ১৯৩৮ সালের ২১ নভেম্বর মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক ব্রিটিশ-বার্মিজ পরিবারে তাঁর জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজলে ১৯৪৩ সালে জাপানি হামলার হাত থেকে বাঁচতে মা ও ভাই-বোনদের সাথে মুম্বাইয়ের পথে পাড়ি জমান হেলেন। পায়ে হাঁটা সেই দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক যাত্রায় পরিবারের এক সদস্যকে হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ভারতে পৌঁছান তাঁরা।

১৩ বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে

সংসারের অভাব আর মায়ের সামান্য নার্সিংয়ের আয়ে দুই ভাই-বোনের ভরণপোষণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৫১ সালে ‘আওয়ারা’ ও ‘সাবিস্তান’ সিনেমায় ড্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ভাগ্যের চাকা ঘোরে ১৯৫৭ সালে ‘হাওরা ব্রিজ’ সিনেমার মাধ্যমে। সেই সিনেমার কালজয়ী গান ‘মেরা নাম চিন চিন চু’ হেলেনকে রাতারাতি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দেয়।

বলিউডের ‘সিলিং পয়েন্ট’ ও আইটেম গানের রানী

হেলেন ছিলেন তৎকালীন হিন্দি ছবির ‘সেলিং পয়েন্ট’। বিশেষ করে সেলিম খান ও জাভেদ আখতারের চিত্রনাট্যে ‘ডন’, ‘শোলে’ কিংবা ‘দোস্তানা’র মতো ব্লকবাস্টার ছবিতে তাঁর উপস্থিতি দর্শকের প্রধান আকর্ষণ ছিল। ‘ডন’ সিনেমায় তাঁর ‘ইয়ে মেরা দিল’ গানটি আজও বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইটেম নাম্বার হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর বিড়ালের মতো চোখ আর মোহনীয় নাচের মুদ্রায় তিনি মুগ্ধ করে রেখেছিলেন কয়েক প্রজন্মকে।

সেলিম খান ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯৬২ সালে ‘কাবিল খান’ সিনেমার সেটে হেলেনের পরিচয় হয় চিত্রনাট্যকার সেলিম খানের সাথে। সেই পরিচয় থেকে প্রেম এবং ১৯৮১ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। হেলেন সেলিম খানের দ্বিতীয় স্ত্রী হলেও তাঁর প্রথম স্ত্রীর পরিবার এবং বিশেষ করে সালমান খানের সাথে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর। বাস্তব জীবনেও তিনি সালমানের ‘মা’ হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য, ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ ছবিতে তিনি পর্দার সালমান খানেরও মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

অবসর ও অর্জন

১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিলেও হেলেন মাঝেমধ্যেই পর্দায় ফিরেছেন। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ কিংবা ‘মোহাব্বাতে’ সিনেমায় তাঁর ছোট উপস্থিতি দর্শকদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। আজীবন সহ-অভিনেত্রীর তকমা থাকা হেলেন মাত্র একবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেলেও (লাহু কে দো রং), তাঁর প্রকৃত সম্মান লুকিয়ে আছে কোটি মানুষের ভালোবাসায়।

ভারতের ইতিহাসের প্রথম ‘আইটেম গার্ল’ থেকে বলিউডের ‘মাদার অব আইটেম নাম্বার’ পর্যন্ত হেলেনের এই দীর্ঘ সফর পরিশ্রম আর হার না মানা মানসিকতার এক অনন্য উদাহরণ।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন