যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক কানাডার

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা সর্বশেষ শুল্কের জবাবে মার্কিন বিভিন্ন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) কানাডীয় কর্মকর্তারা জানান, নতুন এসব শুল্ক প্রায় ২৮ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বা ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর কার্যকর হবে।
পাল্টা শুল্কের আওতায় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য, আসবাবপত্র, পোশাক, প্রসাধনী, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যসহ প্রায় ৯০০ ধরনের পণ্য রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার যেসব পণ্যে শুল্ক আরোপ করেছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নতুন তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অটোয়া।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষই আলোচনার শেষ পর্যায়ে একে অপরের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক দাবি ও অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ তুলেছে।
‘কৌশলগত ও সমানুপাতিক’ পাল্টা ব্যবস্থা
কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায়ই এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি কানাডার সিদ্ধান্তকে ‘সমানুপাতিক’ ও ‘কৌশলগত’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কানাডার শ্রমিক, ব্যবসা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শ্রমিকদের সহায়তায় অতিরিক্ত ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এই সহায়তার মাধ্যমে কর্মী ছাঁটাই কমানো এবং শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যেসব মার্কিন পণ্যে শুল্ক
মঙ্গলবার কানাডা প্রায় ৯০০টি মার্কিন পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্ক;
প্রাকৃতিক মধু, আসবাবপত্র, পোশাক, প্রসাধনী ও সুগন্ধিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক;
ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন, পনিরসহ দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক;
নির্দিষ্ট ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক;
ফর্কলিফট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নির্দিষ্ট সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক।
কানাডীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এমন পণ্যকেই মূলত তালিকায় রাখা হয়েছে, যেগুলোর বিকল্প উৎস কানাডার ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা অন্য দেশ থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন। এর মাধ্যমে পাল্টা শুল্কের প্রভাব কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারে যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার সম্ভাবনা
কানাডার পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দিতে প্রস্তুত ছিল। তবে কানাডা ‘অযৌক্তিক দাবি’ ও পূর্বের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কানাডার বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কয়েক দশক ধরে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য বাণিজ্য করে আসছে। একই সঙ্গে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্য নয় বলে উল্লেখ করে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা না দেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্প এ সপ্তাহে কানাডার গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আগামী ১ জানুয়ারি থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন। এর জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি কানাডার গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লেও মঙ্গলবার উভয় পক্ষের কিছু কর্মকর্তার বক্তব্যে তুলনামূলক কূটনৈতিক সুর দেখা গেছে। ফলে আবারও বাণিজ্য আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কানাডার সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম জরুরি আলোচনার জন্য দেশটির অর্থমন্ত্রী মার্সেলো এব্রার্দকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছেন।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে নতুন করে শুল্ক আরোপের ফলে সীমান্তের উভয় পাশে ব্যবসা ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই বাণিজ্য বিরোধ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।