মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা চাপে ফেলতে পারে কানাডা?

বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা চাপে ফেলতে পারে কানাডা?
ছবি : সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমেই তীব্র হওয়া বাণিজ্য বিরোধে পাল্টা চাপ তৈরির জন্য বেশ কিছু কৌশলগত সুযোগ রয়েছে কানাডার হাতে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃষিপণ্য, ভোক্তা বাজার ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে অটোয়া।

কানাডা তার মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির ক্ষেত্রেই কানাডা শীর্ষ তিন বাণিজ্যিক অংশীদারের একটি। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন উভয় দেশের অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলতে পারে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইতোমধ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত পদক্ষেপে ইস্পাত, দুগ্ধপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষিযন্ত্র, ইলেকট্রনিকস, পাল্প ও কাগজশিল্পের মতো খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের সমপরিমাণ বা ‘ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে পাল্টা চাপ তৈরি করা।

তবে কানাডার হাতে থাকা সম্ভাব্য চাপের ক্ষেত্র শুধু শুল্ক আরোপেই সীমাবদ্ধ নয়।

জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তায় কানাডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশেরও জোগান দেয়।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইঙ্গিত দিয়েছেন, জ্বালানি সরবরাহও প্রয়োজনে আলোচনার অংশ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কানাডার পাল্টা ব্যবস্থায় জ্বালানি খাতকে সরাসরি লক্ষ্য করা হয়নি।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড অবশ্য এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত মাশুল আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

কানাডা পটাশেরও অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক সরবরাহকারী। কৃষিতে সার উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই খনিজের পাশাপাশি দেশটিতে লিথিয়াম, নিকেল ও গ্রাফাইটের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। ফলে এসব কাঁচামালের সরবরাহ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করার সুযোগ রয়েছে অটোয়ার।

মার্কিন পণ্যে কানাডীয়দের অনীহা

বাণিজ্য বিরোধে কানাডা এরই মধ্যে দেখিয়েছে, নিজেদের বিশাল ভোক্তা বাজারকেও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দফার শুল্কের জবাবে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের মদের দোকান থেকে মার্কিন অ্যালকোহল সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর প্রভাবে কানাডায় মার্কিন ওয়াইনের রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যায়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরে কানাডায় মার্কিন ওয়াইন রপ্তানি ৭৮ শতাংশ কমেছে।

মার্কিন ডিস্টিলারদের সংগঠনও জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রদেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে মার্কিন মদজাতীয় পানীয়ের রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে। কানাডার ১৩টি প্রদেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতে এখনো এই বয়কট কার্যকর রয়েছে।

শুধু পণ্য বর্জন নয়, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণেও কানাডীয়দের অনীহা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সড়কপথে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন প্রায় আট লাখ কানাডীয় কম। ভ্রমণ কমে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও কানাডা আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্য কানাডার বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

মেইন, মিশিগান ও উইসকনসিনের মতো অঙ্গরাজ্যের পণ্যের বড় ক্রেতা কানাডা। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫টি অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডা শীর্ষ তিন রপ্তানি বাজারের একটি। ফলে কানাডার পাল্টা শুল্ক বা আমদানি কমানোর সিদ্ধান্ত এসব রাজ্যের ব্যবসা ও শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

কানাডায় পরিচালিত বিভিন্ন জনমত জরিপেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অ্যাঙ্গাস রিডের এক জরিপে প্রায় ৭৬ শতাংশ কানাডীয় অটোয়ার বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।

তবে বাণিজ্য বিরোধে কানাডারও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উচ্চ শুল্কের প্রভাবে স্বল্পমেয়াদে কানাডার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ০.৩ থেকে ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর চাপ

কানাডীয় নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর। শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মার্কিন পরিবারের ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান শুল্কনীতির কারণে মার্কিন পরিবারপ্রতি বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। বাণিজ্য বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নিও সতর্ক করে বলেছেন, কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ও ভোক্তারাই ক্ষতির মুখে পড়বেন। বিশেষ করে মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি ও আলাবামার মতো অঙ্গরাজ্যের গাড়ি শিল্প কানাডার বাজারের ওপরও নির্ভরশীল।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবির ভাষ্য, শুল্কের প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়তে পারে। বাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে মেঝে পরিবর্তন, বিয়ে কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম—সব ক্ষেত্রেই পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নতুন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় কানাডার হাতে রাজনৈতিক চাপ তৈরির আরও একটি সুযোগ রয়েছে। মিশিগান ও মেইনের মতো সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব রাজ্যের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ওপর বাণিজ্য বিরোধের প্রভাব পড়লে তা স্থানীয় রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে।

অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডও ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তার বক্তব্য, এমন পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হবে মার্কিন অর্থনীতিতে বাণিজ্য বিরোধের চাপ স্পষ্ট করে তোলা।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কানাডার জন্য বড় দুর্বলতা হলেও জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ভোক্তা বাজার এবং সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক দেশটির হাতে কিছু শক্তিশালী পাল্টা হাতিয়ারও তুলে দিয়েছে। এখন বাণিজ্য আলোচনায় অটোয়া এসব হাতিয়ার কতটা ব্যবহার করে এবং ওয়াশিংটন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তার ওপরই দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ অনেকটা নির্ভর করছে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন