সুন্দরবনের জলবায়ু প্রকল্পে ব্রিটিশ অর্থছাঁটাই, দুই বছর আগেই বন্ধ হচ্ছে কার্যক্রম

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকারের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে প্রকল্পটি ২০২৮ সালের পরিবর্তে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে গুটিয়ে নেওয়া হবে। এতে সুন্দরবন অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা হাজারো মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) বৈদেশিক সহায়তার বাজেট দেশটির মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ০.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৩ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের পরিচালিত জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্পেও।
প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। তবে অর্থছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের পর চলতি বছরের জুনেই কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের সময়সীমা সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
কমেছে অর্থ, কমেছে সুবিধাভোগীর সংখ্যাও
প্রকল্পটির জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ পাওয়ার কথা ছিল। তবে অর্থছাঁটাইয়ের কারণে সংস্থাটি নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় অনেক কম অর্থ পেয়েছে। ফলে প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগীর লক্ষ্যমাত্রাও ৫৭ হাজার থেকে কমিয়ে ৩৭ হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স লিড তামান্না রহমান বলেন, আকস্মিক অর্থছাঁটাইয়ের কারণে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কার্যক্রম টেকসই করার এবং স্থানীয় অংশীদারদের কাছে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগও কমে গেছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় নানা সহায়তা
সুন্দরবনের কাছাকাছি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রকল্পটি সৌরবিদ্যুৎ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মতো বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
নদীভাঙন ও লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত কালবোগীর মতো এলাকার মানুষও এই প্রকল্পের আওতায় সহায়তা পেয়েছেন। কোনো কোনো পরিবার সৌরবিদ্যুৎচালিত রাইস হাসকিং মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা
যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ার ও লেবার পার্টির এমপি সারাহ চ্যাম্পিয়ন বলেন, কোনো প্রকল্পকে পূর্বঘোষণা ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগে বন্ধ করে দিলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নিম্নআয়ের দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এতে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ব্রিটেনের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রিটিশ এনজিও নেটওয়ার্ক বন্ডের প্রধান নির্বাহী রোমিলি গ্রিনহিলও এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রকল্পটিকে জীবনরক্ষাকারী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য সরকারকে সহায়তার বাজেট পুনর্বহালের আহ্বান জানান।
তবে সমালোচনার বিষয়ে এফসিডিওর এক মুখপাত্র বলেন, সরাসরি অনুদান দেওয়ার নীতি থেকে যুক্তরাজ্য ধীরে ধীরে সরে আসছে। ভবিষ্যতে বিদেশি সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হওয়ায় সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কার্যক্রমের প্রয়োজন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থের অভাবে চলমান প্রকল্পের কার্যক্রম আগেভাগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।