রিজিকের সন্ধানে পরিশ্রম ও আল্লাহর ওপর ভরসার ভারসাম্য

ইসলামে রিজিককে মহান আল্লাহর একান্ত দান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের জীবিকা, সম্পদ ও প্রাপ্তি একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তিনি ‘আর-রাজ্জাক’ বা সর্বোত্তম রিজিকদাতা। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে—যদি রিজিক আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, তাহলে মানুষের এত পরিশ্রম করার প্রয়োজন কেন?
রিজিক নির্ধারণ করেন আল্লাহ
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
"নিশ্চয়ই আল্লাহই প্রকৃত রিজিকদাতা, তিনি মহাশক্তির অধিকারী।"
(সুরা আজ-জারিয়াত: ৫৮)
আরেক আয়াতে এসেছে,
"আল্লাহই সর্বোত্তম রিজিকদাতা।"
(সুরা আল-হাজ্জ: ৫৮)
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, একজন মানুষের জন্মের আগেই তার আয়ু, কর্ম ও রিজিক নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে, মাতৃগর্ভে শিশুর মধ্যে রুহ ফুঁকে দেওয়ার সময় ফেরেশতাকে চারটি বিষয় লিখে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়—এর একটি হলো তার রিজিক।
রিজিক নির্ধারিত, তবু চেষ্টা কেন?
রিজিক নির্ধারিত মানে এই নয় যে মানুষ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। বরং আল্লাহ মানুষকে চেষ্টা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সেই চেষ্টাকেই রিজিক লাভের মাধ্যম বানিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথ তাওয়াক্কুল করতে, তবে পাখিদের মতোই তোমাদের রিজিক দেওয়া হতো। তারা সকালে ক্ষুধার্ত বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।"
(সুনান তিরমিজি)
এই হাদিসে পাখিদের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে, তারা বাসায় বসে থাকে না; খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। একইভাবে মানুষকেও বৈধ উপায়ে জীবিকার জন্য চেষ্টা করতে হবে।
তাওয়াক্কুল ও পরিশ্রম—দুটিই জরুরি
ইসলাম শুধু পরিশ্রমের শিক্ষা দেয় না, আবার কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতেও উৎসাহিত করে না। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
শুধু বসে থেকে রিজিকের অপেক্ষা করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি নিজের সক্ষমতাকেই সবকিছু মনে করে আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও ইসলাম সমর্থন করে না। প্রকৃত সফলতা হলো চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ে।
রিজিক শুধু অর্থ নয়
ইসলামে রিজিকের অর্থ কেবল টাকা-পয়সা বা খাদ্য নয়। সুস্থ শরীর, নিরাপদ জীবন, নেক সন্তান, মানসিক প্রশান্তি, ভালো পরিবার এবং ঈমান—সবই আল্লাহর দেওয়া রিজিক।
দিনশেষে নিরাপদে ঘরে ফেরা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা সুস্থভাবে ইবাদত করার সুযোগ পাওয়াও রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। তাই একজন মুমিনের উচিত কেবল আর্থিক প্রাপ্তির দিকে না তাকিয়ে আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা।
ইসলামের শিক্ষা হলো—রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই বৈধ উপায়ে পরিশ্রম করতে হবে, তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে এবং প্রাপ্ত প্রতিটি নিয়ামতের জন্য শোকর আদায় করতে হবে। এভাবেই দুনিয়ার জীবনে পরিশ্রম ও ঈমানের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।