জ্ঞানের নগরী থেকে ধ্বংসস্তূপ—বাগদাদের করুণ পরিণতি

একসময় বিশ্বের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল বাগদাদ। দজলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই নগরী শুধু আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানীই ছিল না; এটি ছিল এমন এক সভ্যতার প্রতীক, যেখানে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও সংস্কৃতির বিকাশ সর্বোচ্চ মর্যাদা পেত। কিন্তু ১২৫৮ সালে মোঙ্গল শাসক হালাকু খানের নেতৃত্বে সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এই ঐতিহাসিক নগরী।
অষ্টম শতকে আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর পরিকল্পিতভাবে বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। গোলাকার নকশায় নির্মিত এই রাজধানী সে সময়ের অন্যতম আধুনিক নগর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শহরের কেন্দ্রস্থলে ছিল খলিফার প্রাসাদ ও জামে মসজিদ, আর চারদিকে ছিল শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তবে বাগদাদের প্রকৃত শক্তি সামরিক ক্ষমতা নয়, বরং জ্ঞানচর্চা ছিল। খলিফা হারুনুর রশীদ ও আল-মামুনের সময় প্রতিষ্ঠিত বায়তুল হিকমা (হাউস অব উইজডম) বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানে গ্রিক, পারসি, ভারতীয় ও অন্যান্য সভ্যতার অসংখ্য গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করা হতো। মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ও পারসি পণ্ডিতেরা একসঙ্গে গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, রসায়ন ও ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতেন।
পরবর্তীতে নিযামিয়া মাদ্রাসাও ইসলামি বিশ্বের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের জন্য বাগদাদে আসতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়তে থাকে। রাষ্ট্রের এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় মোঙ্গল সাম্রাজ্য।
চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান মধ্য এশিয়া থেকে অগ্রসর হয়ে একের পর এক নগরী দখল করার পর বাগদাদের দিকে অগ্রসর হন। ১২৫৮ সালের শুরুতে তিনি বাগদাদ অবরোধ করেন। কয়েক দিনের অবরোধের পর শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে এবং মোঙ্গল বাহিনী নগরীতে প্রবেশ করে।
এরপর শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, অসংখ্য সাধারণ মানুষ, আলেম, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, নারী ও শিশু নিহত হন। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এটি মধ্যযুগের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই আক্রমণে বায়তুল হিকমার বিপুলসংখ্যক পাণ্ডুলিপি ও মূল্যবান গ্রন্থ ধ্বংস হয়ে যায়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, বহু বই দজলা নদীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং বিপুলসংখ্যক পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এর ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সঞ্চিত জ্ঞানের অমূল্য ভাণ্ডারের বড় একটি অংশ হারিয়ে যায়।
আক্রমণের পর আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহ বন্দি হন এবং পরে নিহত হন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে চলা আব্বাসীয় খেলাফতের অবসান ঘটে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাগদাদের পতন শুধু একটি রাজধানীর পতন ছিল না; এটি ছিল মধ্যযুগীয় বিশ্বের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা। বাগদাদের ধ্বংস আজও মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং জ্ঞানচর্চার গুরুত্বের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।