জলাবদ্ধতা: উন্নয়নের পথে অর্থনীতির নীরব শত্রু

বাংলাদেশে বর্ষা মানেই বৃষ্টি, আর বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা—এ যেন এক চিরচেনা বাস্তবতা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জলাবদ্ধতা আর শুধু নাগরিক দুর্ভোগের বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় কাঠামোগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই যখন রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম কিংবা দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো অচল হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব কেবল যানজট বা জনভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় উৎপাদন, বাণিজ্য, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। এখান দিয়ে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কগুলো জলাবদ্ধতায় ডুবে গেলে কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত হয়, শিল্পকারখানায় কাঁচামাল পৌঁছাতে দেরি হয় এবং সময়মতো রপ্তানি সম্ভব না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে বেনাপোল স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রে পণ্য নষ্ট হওয়া ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঘটনা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই শিল্প সময়নির্ভর। একটি চালান নির্ধারিত সময়ে বন্দরে পৌঁছাতে না পারলে শুধু আর্থিক জরিমানাই নয়, ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশও হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। জলাবদ্ধতার কারণে শ্রমিক কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারা, কারখানায় পানি ঢুকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো ঘটনাগুলো শিল্পখাতকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি ঘটে এমন এক খাতে, যার হিসাব সচরাচর দৃশ্যমান হয় না—শ্রমঘণ্টার অপচয়। লাখো মানুষ যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকে, তখন শুধু ব্যক্তিগত সময় নয়, জাতীয় উৎপাদনশীলতাও কমে যায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দিনের বিক্রি হারান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে উপস্থিতি কমে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে এবং চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এসব মিলিয়ে জলাবদ্ধতার প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি দৃশ্যমান হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন একই চিত্র প্রতি বর্ষায় ফিরে আসে? বাস্তবতা হলো, সমস্যার মূল কারণগুলো এখনো অমীমাংসিত। খাল-নালা দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তাই জলাবদ্ধতাকে আর মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় ইস্যু।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জলপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জবাবদিহি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি কোনো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য শুভ সংকেত নয়। জলাবদ্ধতা শুধু পানি জমার সমস্যা নয়; এটি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর নীরব আঘাত। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এর মূল্য শুধু নগরবাসী নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিকেই দিতে হবে।