ডেঙ্গু আর মৌসুমি রোগ নয়, এটি এখন রাষ্ট্রীয় জনস্বাস্থ্য সংকট

বাংলাদেশে ডেঙ্গু আর কেবল বর্ষাকালের একটি পরিচিত রোগ নয়; এটি এখন দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০০০ সালে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাবের পর গত ২৭ বছরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবেই বেড়েছে। এক সময় ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও এখন দেশের প্রায় সব জেলাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। মৌসুমি রোগের সীমা ছাড়িয়ে এটি এখন প্রায় সারা বছরের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৯৬৫ সালে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও ২০০০ সালে এটি মহামারির রূপ নেয়। এরপর থেকে প্রতি বছরই সংক্রমণ দেখা গেছে, তবে ২০১৯ সালের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে তিন লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন এবং এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং এডিস মশার অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমও বদলে গেছে। আগে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংক্রমণ বেশি থাকলেও এখন নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সারা বছরই সংক্রমণ অব্যাহত থাকছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব। এখনো অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় জরিপ ছাড়া গণহারে ফগিং করা হচ্ছে, অথচ মশার প্রকৃত প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। একই সঙ্গে ভাইরাসের ধরন, মশার আচরণ ও প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাও সীমিত।
চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও রয়েছে নানা ঘাটতি। গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুবরণকারী অনেক রোগী জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী সেবা পাননি। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরয়েড ব্যবহার, দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং জটিলতা শনাক্তে বিলম্ব মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় কেবল সিটি করপোরেশনের ফগিং কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, প্রতিটি হাসপাতালে কার্যকর ফিভার ক্লিনিক, আধুনিক গবেষণায় বিনিয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কর্মসূচি।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, এসির ট্রে, ফুলের টব ও পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ এডিস মশার জন্মস্থল ধ্বংস না করলে ওষুধ ছিটিয়েও দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যাবে না।
ডেঙ্গু এখন কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সিটি করপোরেশনের একক দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার মতোই একটি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষের সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।