জনসংখ্যা নয়, মানবসম্পদ গড়াই হোক মূল লক্ষ্য

প্রতি বছরের ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জনসংখ্যা শুধু সংখ্যা নয়, এটি একটি দেশের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই তরুণ। তাই জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে নয়, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’ সময়োপযোগী। কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু তাদের দক্ষতা, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধা (Demographic Dividend) দ্রুতই চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু কমানো এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে এখনও জনসংখ্যার চাপ, শহরমুখী অভিবাসন, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য এবং দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হওয়া উদ্বেগের বিষয়।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সেই জনসংখ্যার গুণগত মানের ওপর। এজন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়ন। একই সঙ্গে কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে শুধু দেশের শিল্প ও সেবা খাতই নয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও আরও শক্তিশালী হবে।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের এই দিনে আমাদের প্রত্যাশা—নীতিনির্ধারকেরা জনসংখ্যাকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করবেন। তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জনসংখ্যা যদি দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতার শক্তিতে রূপ নেয়, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর সেই লক্ষ্য অর্জনেই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।