হাসিনা ও স্বজনদের ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ, ৮০ শতাংশ এখনও কার্যত মালিকদের নিয়ন্ত্রণে

দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের নির্দেশ থাকলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনও কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের নথি অনুযায়ী, আদালতের আদেশে দেশে ও বিদেশে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ স্থাবর সম্পদ হওয়ায় সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় রিসিভার নিয়োগ এখনও সম্পন্ন হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জব্দ হওয়া সম্পদের প্রায় ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রেই রিসিভার নিয়োগ হয়নি, ফলে কাগজে-কলমে সম্পদ জব্দ থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর সুবিধা ভোগের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার একটি আবাসিক ভবনে অবস্থিত একটি ফ্ল্যাটের মালিক ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক। আদালত ২০২৫ সালে ওই সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত সেখানে রিসিভার নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
একইভাবে, রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শেখ রেহানার নামে থাকা একটি ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশের দীর্ঘ সময় পরও কার্যকরভাবে দুদকের নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, জব্দ হওয়া মোট সম্পদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ দেশে অবস্থিত। এর মধ্যে ৬ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা রিসিভার নিয়োগের উদ্যোগ নেন। তবে সম্পদ বুঝে নেওয়া, মালিকানা যাচাই এবং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাস্তব জটিলতা রয়েছে।
অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দপ্তর থেকে তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ, মালিকানা যাচাই এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি জনবল সংকটও কাজের গতি কমিয়ে দেয়।
তবে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম মনে করেন, সমস্যার মূল কারণ জনবল সংকট নয়, বরং কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি।
তার ভাষায়, আইন অনুযায়ী জব্দ হওয়া সম্পদ থেকে অর্জিত আয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কথা। কিন্তু রিসিভার নিয়োগে বিলম্ব হওয়ায় অভিযুক্তরা এখনও পরোক্ষভাবে সম্পদের সুবিধা পাচ্ছেন।
যদিও কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পদে রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে এবং সেসব সম্পদ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থ জমা হওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের জব্দাদেশ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষায় দুদককে আরও দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত সম্পদ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে অনেক সম্পদ এখনও কার্যত পূর্বতন মালিকদের প্রভাবের বাইরে আনা সম্ভব হয়নি।