‘অনেকবার বলেছি, দরজাটা খোলো’

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার কার্যক্রমে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তারা দুজনই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
মঙ্গলবার (২ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এ সময় মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকেও আদালতে হাজির করা হয়।
প্রথমে সাক্ষ্য দেন মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি আদালতকে জানান, ঘটনার দিন সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার পর স্ত্রীর কাছ থেকে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পান। দ্রুত বাসায় ফিরে এসে দেখতে পান প্রতিবেশীরা একটি ফ্ল্যাটের সামনে জড়ো হয়েছেন এবং দরজা ভাঙার চেষ্টা করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় স্থানীয়দের সহায়তায় তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। সেখানে বিভিন্ন কক্ষ বন্ধ অবস্থায় ছিল এবং এক পর্যায়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পরে থানায় গিয়ে মামলা করেন।
পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাকে জেরা করেন। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে তিনি যা প্রত্যক্ষ করেছেন, আদালতে সেটিই তুলে ধরেছেন। আসামিদের সঙ্গে তার কোনো পূর্বপরিচয় বা ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না বলেও জানান।
এরপর সাক্ষ্য দেন রামিসার মা পারভীন আক্তার। আদালতে তিনি বলেন, ঘটনার দিন বাসায় রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিছু সময় পর ছোট মেয়ে রামিসাকে খুঁজে না পেয়ে আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে একটি ফ্ল্যাটের সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয়।
তিনি জানান, প্রতিবেশীদের নিয়ে বারবার দরজায় ধাক্কা দেওয়া হলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে আরও লোকজন এসে দরজা ভাঙার উদ্যোগ নেয়। পরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান।
আবেগঘন কণ্ঠে পারভীন আক্তার আদালতে বলেন, তিনি বহুবার অনুরোধ করেছিলেন যেন দরজাটি খোলা হয়, কিন্তু ভেতর থেকে কেউ দরজা খোলেনি।
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আদালতে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে শিশু সাক্ষী হওয়ায় রামিসার বড় বোনের বক্তব্য বিশেষ পদ্ধতিতে (ক্যামেরা ট্রায়াল) গ্রহণ করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এর আগে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষ মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে নিখোঁজ হওয়ার পর একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর এক আসামিকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় এবং অপর আসামিকে পরে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।