হামে শিশুমৃত্যুতে মায়েদের দায় কতটা? বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই আক্রান্ত শিশুদের বাঁচাতে চিকিৎসক ও অভিভাবকেরা লড়াই করছেন। একই সঙ্গে সামাজিক আলোচনায় উঠে আসছে মায়েদের ভূমিকা ও দায় নিয়ে বিতর্ক।
সম্প্রতি একটি মহলে দাবি করা হয়, কিছু মায়ের মধ্যে ‘ফিটনেস সচেতনতা’র কারণে শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ানোর প্রবণতা রয়েছে, যা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমাচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতামত এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়।
রাজধানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হামে আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের পরিবারের। এসব মায়ের বড় অংশেরই পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমিত ক্ষমতা রয়েছে। ফলে শিশুর টিকা, পুষ্টি ও নিয়মিত যত্ন নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি জরিপ অনুযায়ী, দেশে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিংয়ের হার কিছুটা কমলেও এর প্রধান কারণ হিসেবে দেরিতে দুধ খাওয়ানো শুরু, বিকল্প দুধের ব্যবহার, বোতলে খাওয়ানোর অভ্যাস এবং সচেতনতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মায়ের ‘ফিটনেস সচেতনতা’কে প্রধান কারণ হিসেবে কোনো আনুষ্ঠানিক গবেষণায় প্রমাণিত তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ টিকাদানে ঘাটতি এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা। গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে তৈরি হওয়া “ইমিউনিটি গ্যাপ”কে তারা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফও জানিয়েছে, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি ও কাভারেজ কমে যাওয়াই হামের বিস্তারের প্রধান কারণ। পাশাপাশি হাসপাতাল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসা সেবার চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে বিভিন্ন জরিপে। দেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের একটি বড় অংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন এবং নিয়মিত প্রসবপূর্ব সেবা পাওয়ার হারও প্রত্যাশিত মাত্রায় নয়।
নারী অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু মৃত্যুর মতো জটিল সমস্যাকে এককভাবে মায়েদের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত কারণগুলো আড়ালে চলে যায়। তাদের মতে, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যসেবা ঘাটতি, টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতাই মূল চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, হামে শিশুমৃত্যু রোধে দোষারোপের পরিবর্তে টিকাদান, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই সবচেয়ে জরুরি।