মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

লক্ষ্মীপুরে মাদককে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সহিংসতা, ২০ জনের মৃত্যু

লক্ষ্মীপুরে মাদককে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সহিংসতা, ২০ জনের মৃত্যু
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

লক্ষ্মীপুর জেলায় মাদককে কেন্দ্র করে এক বছরে শিশুসহ ২০ জন নিহত হওয়ার ঘটনা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। একই সময়ে গুলিবিদ্ধসহ নানা ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এখন মাদক সহজলভ্য। ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বিস্তারে তরুণ সমাজ ভয়াবহভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামাজিক নিরাপত্তায়—বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ইভটিজিংসহ নানা অপরাধ। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৪৫টি অভিযান পরিচালনা করে ১১৬টি মামলা দায়ের এবং ১২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে ২৮৪টি মামলায় ৩৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

তদন্তে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় মাদক কারবার পরিচালিত হচ্ছে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ও বিকাশ-নগদের মাধ্যমে লেনদেন করে সংঘবদ্ধ চক্র। জেলার বিভিন্ন এলাকায় রিকশা, সিএনজি ও মোটরসাইকেলে করে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় মাদক কারবারে জড়িত অন্তত ৪২ জন সক্রিয় রয়েছে, যাদের মধ্যে ৮ জন গডফাদার, ১৩ জন এজেন্ট ও ১৯ জন পাইকারি বিক্রেতা। তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।

মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় রায়পুরে এক কলেজছাত্রকে সন্দেহের বশে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া মা-সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্বে খুনসহ একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর পেছনে রয়েছে মাদকসংক্রান্ত বিরোধ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, একসময় গাঁজা ও ফেনসিডিলের আধিক্য থাকলেও এখন ইয়াবা প্রধান মাদক হিসেবে বিস্তার লাভ করেছে। কক্সবাজার থেকে সড়ক ও নৌপথে ইয়াবা আসে, আর ভারত থেকে সীমান্ত হয়ে গাঁজা প্রবেশ করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় সড়কে পর্যাপ্ত চেকপোস্ট না থাকায় মাদক পরিবহন সহজ হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এসব মাদক ভোলা ও চাঁদপুরে পাচার করা হচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, “মাদক নির্মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, “মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ আপসহীন। 

তবে আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ার প্রবণতা অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক নির্মূলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন