লক্ষ্মীপুরে ‘স্বপ্ন যাত্রা’ অ্যাম্বুল্যান্স সেবা মুখ থুবড়ে

লক্ষ্মীপুরে জনপদের মানুষের দোরগোড়ায় জরুরি চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল ‘স্বপ্ন যাত্রা’ অ্যাম্বুল্যান্স সেবা।
কিন্তু যথাযথ তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অভাবে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগ এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০২৩ সালে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা সরকারি অর্থ ব্যয়ে ১৬টি অ্যাম্বুল্যান্স ক্রয় করে এ সেবা চালু করা হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন আকন্দ ‘একটি গ্রাম–একটি শহর’ প্রকল্পের আওতায় এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি তিনটি ইউনিয়নের জন্য একটি করে অ্যাম্বুল্যান্স বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, স্বল্প খরচে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে রোগী পরিবহন নিশ্চিত করা। কিন্তু শুরু থেকেই নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। নির্ধারিত সীমার মধ্যে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে চালকরা দূরপাল্লার যাত্রা—বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে রোগী পরিবহনে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এতে স্থানীয় রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টরা অ্যাম্বুল্যান্সগুলো ব্যক্তিগত, পারিবারিক এমনকি রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করেছেন। এতে সেবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
২০২৪ সালের ৫ জুলাই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে। অনেক অ্যাম্বুল্যান্স থেকে ‘স্বপ্ন যাত্রা’ নামের স্টিকার খুলে ফেলা হয়। এরপর থেকে কার্যক্রম অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। কিছু চালক দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যান, আবার কিছু অ্যাম্বুল্যান্স সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হামছাদী ইউনিয়নের অ্যাম্বুল্যান্সটি প্রায় ১৫ মাস ধরে বিকল রয়েছে। রামগতি উপজেলার চরগাজী ইউনিয়নের অ্যাম্বুল্যান্সটি চালক সংকটে বন্ধ রয়েছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে আরও কয়েকটি অ্যাম্বুল্যান্সের ক্ষেত্রেও।
বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক কার্যক্রমটি কার্যত বন্ধ। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অ্যাম্বুল্যান্সগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চালুর পর প্রথমদিকে এই সেবা অনেক রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা পেতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সেবাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশেষ করে দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সচেতন মহলের মতে, যথাযথ তদারকি, জবাবদিহিতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবেই এমন একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। তারা দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্সগুলো মেরামত, চালক নিয়োগ এবং ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নসহ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনের আন্তরিক উদ্যোগ, নিয়মিত নজরদারি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ‘স্বপ্ন যাত্রা’ অ্যাম্বুল্যান্স সেবাটি পুনরায় চালু করা গেলে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসা সেবায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।