নববী দৃষ্টান্তে রমজানের দান: কোরআন ও হৃদয়ের মিলন

রমজান কেবল সিয়ামের মাস নয়; এটি হৃদয় ও উদারতার মাস। ক্ষুধা মানুষকে সংযম শেখায়, অন্যের অভাব উপলব্ধি করায়, এবং দানশীলতা বৃদ্ধি করে। এই মাসে দানের গুরুত্ব ও বহুগুণ বৃদ্ধি সম্পর্কে জীবন্ত উদাহরণ পাওয়া যায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের জীবনে।
ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন সব মানুষের চেয়ে অধিক দানশীল।
আর রমজানে যখন জিবরাঈল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা আরো বেড়ে যেত। প্রতি রাতেই জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁর সঙ্গে কোরআন পর্যালোচনা করতেন। তখন তিনি রহমতসহ প্রেরিত বায়ুর চেয়েও অধিক দান করতেন। (বুখারি, হাদিস : ১৯০২)
এই হাদিসে কয়েকটি গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে।
প্রথমত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দান ছিল স্বভাবজাত। তিনি শুধু প্রয়োজনমতো দিতেন না; তাঁর অন্তর ছিল উদারতায় ভরা। কিন্তু রমজানে সেই উদারতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাত। এর কারণ ছিল কোরআনের সান্নিধ্য।
জিবরাঈল (আ.)-এর সঙ্গে কোরআন পাঠ ও পর্যালোচনা তাঁর অন্তরকে আরো নরম, আরো আলোকিত করে তুলত। কোরআনের আয়াত মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আখিরাতের স্থায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে সম্পদ তখন আর আঁকড়ে রাখার বস্তু থাকে না; তা হয়ে ওঠে আল্লাহর পথে ব্যয়ের উপকরণ।
দ্বিতীয়ত, তাঁকে ‘রহমতসহ প্রেরিত বায়ু’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বায়ু যেমন দিকভেদে ছড়িয়ে পড়ে এবং কাউকে বঞ্চিত করে না, তেমনি তাঁর দানও ছিল ব্যাপক, দ্রুত এবং নিরবচ্ছিন্ন।
এতে ব্যক্তিগত খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা ছিল না; ছিল শুধু কল্যাণের বিস্তার।
তৃতীয়ত, এই হাদিস ইঙ্গিত দেয়— ইলম ও দানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোরআনের সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, তত হৃদয়ে উদারতা জন্ম নেয়। তাই রমজানে কোরআন তিলাওয়াত, তার অর্থ অনুধাবন এবং সেই আলোকে সমাজের অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো— এগুলো একে অপরের পরিপূরক।
আজ আমাদের সমাজে দানের প্রবণতা আছে, কিন্তু কখনো তা আবেগনির্ভর, কখনো প্রদর্শনমূলক। নববী আদর্শ শেখায়—দান হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নীরবে, আন্তরিকভাবে এবং প্রয়োজনমাফিক। জাকাত হোক বা নফল সদকা, তা যেন কোরআনের আলোয় পরিচালিত হয়।
রমজান আমাদের সামনে আবার সেই সুযোগ নিয়ে আসে— হৃদয়কে কোরআনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং হাতকে উদারতায় অভ্যস্ত করা। যদি আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারি, তবে আমাদের দান শুধু ক্ষুধা নিবারণ করবে না; সমাজে রহমতের বাতাস বইয়ে দেবে।