বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক নির্বাচন

জেন-জি নেতৃত্বাধীন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতির পর আজকের নির্বাচন নিছক আরেকটি ভোট নয়—এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হওয়ার সম্ভাবনা বহন করছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টিতেও এই নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্বের প্রথম নির্বাচন হিসেবে বাংলাদেশ একটি নজির স্থাপন করছে। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন নয়; বরং একটি আন্দোলনের সাংবিধানিক পরিণতি কতটা গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়, তারও মূল্যায়ন।
প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েক মাসের অস্থিরতায় অর্থনীতি, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। আন্তর্জাতিক আস্থাও কিছুটা টালমাটাল হয়েছে। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও অপরিহার্য।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে দুই হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অংশ নিচ্ছে অন্তত ৫০টি দল—যা একটি রেকর্ড। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই প্রধান জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে বিরোধী শক্তির জন্য এটি সুযোগ, অন্যদিকে এটি নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্নও তুলতে পারে।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণভোট। সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো—নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ—এসবই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। যদি জনগণ এসব প্রস্তাবে সায় দেয়, তবে তা রাষ্ট্র কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।
তবে গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল ভোটগ্রহণের দিনে সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হওয়া, ফল দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ, এবং সর্বোপরি সব পক্ষের ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা কোন পথে এগোবে।
নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তবু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর এসেছে। এগুলো যেন নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, সে দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। যাদের অনেকেই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন। এই প্রজন্মই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছে। এখন তারাই ব্যালটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন বার্তা বহন করে—রাস্তায় আন্দোলনের পরিণতি যদি ব্যালটে রূপ পায়, তবে সেটিই গণতন্ত্রের শক্তি।
বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গণঅভ্যুত্থান ছিল পরিবর্তনের ঘোষণা; নির্বাচন সেই পরিবর্তনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি হতে পারে। যদি এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, তবে তা কেবল একটি সরকার গঠন করবে না—বরং প্রমাণ করবে, বাংলাদেশ সত্যিই গণতান্ত্রিক নবজাগরণের পথে হাঁটছে।
ইতিহাসের এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন সংযম, সহনশীলতা এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মালিক জনগণই—আর তাদের ভোটই গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ ভাষ্য।