নির্বাচনী মাঠে সহিংসতার ছায়া; গণআতঙ্ক ও দায়িত্বশীল নিরাপত্তার প্রয়োজন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বেড়েই চলেছে। প্রচারণার শুরু থেকে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ এবং হামলার ঘটনা দিনে দিনে বাড়ছে। জনসভা, গণসংযোগ, নির্বাচনী অফিস—সবক্ষেত্রেই সহিংসতা প্রকাশ পাচ্ছে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে।
গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের শ্রীবরদীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা সেক্রেটারি নিহত হন। একই দিনে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের খুলশী থানার আমবাগান এলাকায়ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং হাতাহাতি হয়েছে। সর্বশেষ ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরে নির্বাচনী প্রার্থীকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টা এবং হুমকির ঘটনা ঘটেছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর সরাসরি প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে।
নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে অন্তত চারটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ৫৫টি সংঘর্ষ, ছয়টি প্রার্থীর ওপর হামলা, ১৭টি প্রচারণায় বাধা, ৮টি নির্বাচনী অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় ইতিমধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন, বহু আহত হয়েছেন, যা নির্বাচনী মাঠে নিরাপত্তাহীনতার দৃশ্যমান প্রমাণ।
কুমিল্লা এবং লক্ষ্মীপুর নির্বাচনী সহিংসতার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, হোমনা ও সদর উপজেলায় দলীয় অফিস, সমর্থকদের বাড়ি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর বহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনী প্রচারণা, লিফলেট বিতরণ এবং মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনাও নজরকাড়া। এসব এলাকায় স্থানীয়ভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়টি একদিনের তফসিল বা একক ঘটনার ফল নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অস্ত্র-সঞ্চয়ের ফল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ‘টার্গেট কিলিং’, বিদ্রোহী প্রার্থী কেন্দ্রিক সংঘাত এবং অগ্নিসংযোগের ঝুঁকি তত বাড়বে। লুট হওয়া অস্ত্র এখনও উদ্ধার না হওয়ায় এসব ঝুঁকি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা বাহিনী ইতিমধ্যে ১৫০৭ জনকে গ্রেপ্তার এবং ১৫৩টি অস্ত্র ও ১৮৩৪টি গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান চালাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, নির্বাচনী মাঠে কাউকেই আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া হবে না। যারা বেআইনি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।
তবে, শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধে দরকার—জনসচেতনতা, রাজনৈতিক দলের স্ব-নিয়ন্ত্রণ, মাঠ পর্যায়ে শান্তিপ্রিয় সমর্থকদের সমন্বয়, এবং প্রয়োজনীয় স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
নির্বাচনের অধিকার সবার, কিন্তু ভোটের মাঠ যদি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনায় বড় ক্ষতি করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখে—এটি নিশ্চিত করা প্রত্যেকের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব।
নির্বাচনী সহিংসতা প্রতিরোধে দেরি করলে রক্তের ছাপ ও গণআতঙ্ক শুধু বাড়বে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সময় এসেছে—নিরাপত্তা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের সমন্বয়ে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের।