সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
Natun Kagoj

সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে মায়ের দোয়া ও আদর্শের শক্তি

সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে মায়ের দোয়া ও আদর্শের শক্তি
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা শুরু হয় মায়ের কোল থেকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম বা অফিসের ডেস্ক থেকে নয়। মায়ের কোল হলো সন্তানদের প্রথম পাঠশালা, প্রথম মাদরাসা, প্রথম চরিত্র গঠনের স্থান। পৃথিবীতে যত মানুষ সাফল্য বা আলোকিত চরিত্র নিয়ে পরিচিত হয়েছেন, তাদের পেছনে প্রায়ই দেখা যায় এক মায়ের নীরব দোয়া, ত্যাগ ও আদর্শের প্রভাব।

আজকের সমাজে সন্তান প্রতিপালনকে প্রায়ই শুধু খাবার, পোশাক, স্কুল ও কোচিং পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম সন্তান গঠনের ক্ষেত্রে বলেছে, প্রকৃত শক্তি হলো মায়ের দোয়া ও আদর্শিক জীবনযাপন। এই দুটি অদৃশ্য শক্তি একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে, যার ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ সারা জীবন স্থিতিশীল থাকে।

ইসলামে মায়ের দোয়ার মর্যাদা অত্যন্ত বিস্তৃত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ধরনের দোয়া অবশ্যই কবুল হয়:

মজলুমের দোয়া

মুসাফিরের দোয়া

সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া
(আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩৬)

শিক্ষাবিদদের মত, মায়ের দোয়ার প্রভাব সবচেয়ে গভীর, কারণ সন্তান জন্ম, লালন ও মানসিক গঠনে মায়ের উপস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, “সন্তানের অন্তর যে পথে বাঁক নেয়, তা মূলত নির্ভর করে তার ঘরে উচ্চারিত দোয়া ও কথার ওপর।” (তুহফাতুল মাওদূদ)

একজন মা যদি রাতের শেষ প্রহরে অশ্রুসজল চোখে সন্তানের জন্য হেদায়েত, ঈমান ও নিরাপত্তা কামনা করেন, সেই দোয়া শব্দ হয়ে বাতাসে মিললেও, তার প্রভাব সন্তানের চরিত্রে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

পবিত্র কোরআনেও মায়ের দোয়ার প্রভাব দেখা যায়। ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া:

“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সালাত কায়েমকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং আমার বংশধরদেরও।” (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪০)

এই ধারাবাহিকতাতেই ইসমাঈল (আ.), ইসহাক (আ.) ও পরবর্তী নবীদের জীবন গঠিত হয়। আলেমরা বলেন, এক প্রজন্মের দোয়া অনেক সময় কয়েক প্রজন্ম পরে প্রতিফলিত হয়।

শুধু দোয়া নয়, মায়ের আদর্শিক জীবনও সন্তানের জন্য শক্তিশালী শিক্ষা। শিশু প্রথমে শোনে না, দেখে—মায়ের নামাজ, কথা বলার ভঙ্গি, রাগ নিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর ওপর ভরসা দেখে শেখে। ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, “শিশুর অন্তর কাঁচা মাটির মতো; যা প্রথমে তাতে আঁকা হয়, সেটাই স্থায়ী হয়।”

একজন মা যদি সত্যবাদিতা, ধৈর্য, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতি ধারণ করেন, তা সন্তান নিজে দেখে শেখে। ইতিহাস প্রমাণ করে, ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মা দারিদ্র্যের মধ্যেও ছেলেকে ইলমের পথে স্থির রেখেছিলেন। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর দৃষ্টি ফেরানোর পেছনেও মায়ের দোয়ার বরকত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

আজকের মা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি—ডিজিটাল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয় ও সময়ের স্বল্পতা। তবুও ইসলাম তাকে অসহায় রাখে না; প্রতিটি ধৈর্য ও নীরব কষ্টকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন,

“যদি কেউ তার ছোট সন্তানদের জন্য পরিশ্রম করে, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। এবং যদি সে তার বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য পরিশ্রম করে, সেটিও আল্লাহর পথে।” (সিলসিলা সহিহা: ২/৫৩৮)

আদর্শ সমাজ গঠনে আজ মায়ের দোয়া ও আদর্শকে অদৃশ্য শক্তি হিসেবে দেখা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবার দায়িত্ব হলো মাকে সম্মান, সময় ও মানসিক নিরাপত্তা দেয়া। কারণ একজন আলোকিত মা মানে একটি আলোকিত প্রজন্ম।

মা হয়তো ইতিহাসের শিরোনামে নেই, আলোচনার মঞ্চে নেই; কিন্তু তার নীরব দোয়া ও আদর্শের ভেতর লুকিয়ে থাকে জাতির ভবিষ্যৎ। সন্তানের জীবন ও চরিত্রের অনেকটাই নির্ধারিত হয় সেই দোয়াগুলোতে, যা শুধু আল্লাহ শুনেন।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন