নির্বাচনের আগের আতঙ্ক, ভোটের পর স্বস্তি?

২০২৫ সাল বাংলাদেশের জন্য আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটের বছর ছিল। সারাদেশে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ এবং নারীর ও শিশুর ওপর নৃশংস অত্যাচারের ঘটনা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও অনেক ঘটনার শিকার হয়েছেন। পুলিশের উপস্থিতি সর্বত্র কার্যকর ছিল না; কখনো তারা নীরব, কখনো অতিমাত্রায় সক্রিয়—ফলে দুর্বৃত্তরা সুযোগ নিয়ে অরাজকতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও ২০২৫ সালে দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা উদ্বেগজনকভাবে নাজুক ছিল। খুন, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ এবং নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে খুনের মামলা হয়েছে তিন হাজার ৫০৯টি, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২৮১টি বেশি। রাজনৈতিক কারণে অন্তত ৯৮ জন খুন হয়েছেন।
এই বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা অন্তর্ভুক্ত—মাগুরায় ৮ বছরের শিশুর ধর্ষণ ও মৃত্যু, ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অন্তঃসত্ত্বা নারীর উপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, নারায়ণগঞ্জে ১৪ বছরের কিশোরীকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ধর্ষণচেষ্টা, রাঙ্গামাটিতে ৩ বছরের শিশুর ওপর ধর্ষণ। রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে পাথর ও ইট দিয়ে হত্যা, বনশ্রী এলাকায় ১৬০ ভরি সোনা ছিনতাই, এবং জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড—এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে—অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। রাজনৈতিক উত্তেজনার সুযোগ নিয়েও সহিংসতা এবং ছিনতাই বেড়েছে। পুলিশ বাহিনীর হারানো মনোবল এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। সবখানে তাদের উপস্থিতি কার্যকর নয়; কখনো তারা নীরব, কখনো বেসামাল। এসব সুযোগে অপরাধী চক্র অরাজকতা ছড়িয়েছে।
নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক সমাবেশ, ভোটকেন্দ্র নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী দায়িত্বে ব্যস্ত থাকে। ফলে সাধারণ অপরাধ দমনে মনোযোগ কমে যায়। তবে নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যদি কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ হয়।
প্রথমত, রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানো জরুরি। ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলে আন্দোলন, সহিংস কর্মসূচি ও সংঘর্ষ কমতে পারে, যা সাধারণ জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে সিদ্ধান্তহীনতা কমে আসবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে মনোনিবেশ করতে পারবে। তৃতীয়ত, অপরাধ দমনে মনোযোগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। নির্বাচনের দায়িত্ব শেষ হলে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী হত্যা, ছিনতাই, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে মাঠে নামতে পারবে।
একজন অপরাধ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়। এটি সামাজিক সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃস্থাপনের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন-পরবর্তী স্বাভাবিকতা এবং সহিংসতার ছায়া কাটাতে প্রয়োজন সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক আচরণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল প্রশাসন। অন্যথায়, ২০২৫ সালের সহিংস অভিজ্ঞতা দেশের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির সুযোগ রাখে। তবে তা স্বয়ংক্রিয় নয়। দেশের মানুষ, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলো যদি দায়িত্বশীল ও সচেতনভাবে কাজ করে, তবেই নাগরিক জীবনে স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে।