নকশাবিহীন ভবন, নীতিমালা ও শাস্তির ফাঁদে রাজউক

রাজধানী ঢাকায় গড়ে ওঠা লাখ লাখ নকশাবিহীন ও অনুমোদনহীন ভবন বহুদিন ধরেই নগর ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা নয়, তবু দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অবশেষে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) নকশাবিহীন ভবনের বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি—তবে এর বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব ভবন জাতীয় বিল্ডিং কোড, রাজউকের মাস্টারপ্ল্যান ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে, সেগুলোকে নির্দিষ্ট জরিমানার মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হবে। নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচ গুণ জরিমানার প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এতে প্রশ্ন থেকেই যায়—দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম ভেঙে যারা ভবন নির্মাণ করেছে, তারা কি শেষ পর্যন্ত পুরস্কৃতই হবে?
অন্যদিকে, ৭০ বছরের পুরোনো ‘টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩’ সংশোধন করে নতুন করে ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অধ্যাদেশ-২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ সময়োপযোগী। নতুন আইনে মাস্টারপ্ল্যান লঙ্ঘনের জন্য দুই বছর কারাদণ্ড ও ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা নগর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি শক্ত বার্তা দিতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে—আইন যত কঠোরই হোক, প্রয়োগ দুর্বল হলে তার কার্যকারিতা থাকে না।
নগর পুনঃউন্নয়ন, ভূমির পুনর্বিন্যাস এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ফলে ভূমির মূল্যবৃদ্ধিজনিত সুবিধা রাষ্ট্রের কাছে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবগুলো আধুনিক নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে রাস্তা দখল, খোলা জায়গায় অবৈধ নির্মাণ, জলাধার ভরাট কিংবা নিরাপত্তাবেষ্টনী অপসারণের মতো অপরাধে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান আশাব্যঞ্জক। তবে প্রশ্ন হলো—রাজউক নিজেই কি এসব অপরাধ রোধে যথেষ্ট সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারবে?
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের বক্তব্য যথার্থভাবেই রাজউকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তার মতে, রাজউক মূল দায়িত্ব—পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ—ছাপিয়ে প্রকল্প, প্লট ও ফ্ল্যাট উন্নয়নে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। আমলানির্ভর পরিচালনা পর্ষদ সংস্কার না হলে রাজউকের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কঠিনই থেকে যাবে।
এদিকে, ড্যাপ সংশোধন ও নতুন ইমারত বিধিমালার মাধ্যমে ভবনের উচ্চতা ও জনঘনত্ব বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রাজধানীর আবাসন সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে খোলা জায়গা সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা না গেলে এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, নকশাবিহীন ভবনের বৈধতা, নতুন আইন ও বিধিমালা—সবই কাগজে-কলমে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—রাজউক কি এবার সত্যিকার অর্থে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারবে? নাকি আবারও ছাড়, সমঝোতা আর প্রভাবশালীদের চাপে রাজধানীর পরিকল্পিত নগরের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে?
পরিকল্পিত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে হলে কেবল নীতিমালা নয়—দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগ। অন্যথায়, নকশাবিহীন ভবনের শহর আরও ঘনীভূত হবে, সংকটও হবে আরও গভীর।