তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন: রাজনীতির দায় এড়ানোর সময় শেষ

দীর্ঘ সতেরো বছর পর তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে এটি কেবল আবেগের উপলক্ষ নয়, বরং একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্ত। এতদিন ধরে যে প্রশ্নটি দেশের রাজনীতিকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল—‘তারেক রহমান কেন নেই’—তার উত্তর মিলছে ২৫ ডিসেম্বর। কিন্তু একই সঙ্গে সামনে চলে আসছে আরও বড় ও কঠিন প্রশ্ন: তিনি দেশে ফিরে কী করবেন, এবং কী করবেন না?
ওয়ান-ইলেভেন–পরবর্তী সময়ে তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং দীর্ঘ প্রবাসজীবন ছিল একদিকে রাষ্ট্রীয় দমননীতির ফল, অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বশূন্যতার দীর্ঘ অধ্যায়ের সূচনা। এই সময়ে বিএনপি বহু আন্দোলন করেছে, বহু সংকট পার করেছে, আবার বহু সুযোগও হারিয়েছে। বাস্তবতা হলো—দূরে থেকেও তারেক রহমান দলীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও, সরাসরি রাজনীতির মাঠে না থাকায় দলটি সিদ্ধান্তহীনতা ও কৌশলগত দুর্বলতায় ভুগেছে।
এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে প্রত্যাবর্তনের অর্থ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা বিএনপির জন্য স্বস্তির খবর, কিন্তু এটিকে ‘রাজনৈতিক পুনর্জন্ম’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজনীতি স্মৃতি দিয়ে চলে না, চলে সমসাময়িক বাস্তবতা ও দায়িত্ব দিয়ে। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো আমূল বদলে গেছে। বিরোধী রাজনীতির ভাষা, আন্দোলনের ধরন এবং জনগণের প্রত্যাশা—সবই নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।
এই বাস্তবতায় তারেক রহমানকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি শুধু অতীতের উত্তরাধিকার বহন করছেন না, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম।
তারেক রহমানের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট:
প্রথমত, দলীয় সংস্কার ও নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ। দীর্ঘদিন দূরে থাকার ফলে বিএনপিতে ব্যক্তিনির্ভরতা বেড়েছে, কাঠামোগত দুর্বলতাও তৈরি হয়েছে। দেশে ফিরে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
দ্বিতীয়ত, সহিংস রাজনীতির ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসা। অতীতের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে অস্বীকার না করে, বরং রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে সামনে এগোনোর ভাষা তৈরি করাই হবে পরিণত নেতৃত্বের পরিচয়।
তৃতীয়ত, জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক এজেন্ডা উপস্থাপন। কেবল সরকারবিরোধিতা নয়—অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জরুরি।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির নয়, রাষ্ট্রের জন্যও একটি পরীক্ষা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতার নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। প্রতিহিংসা বা প্রশাসনিক বাধা সৃষ্টি হলে তা কেবল ব্যক্তির নয়—গণতন্ত্রের ক্ষতি করবে।
একই সঙ্গে আইন ও বিচারের প্রশ্নেও দ্বিচারিতা পরিহার করতে হবে। আইনের শাসন মানে প্রতিপক্ষকে দমন নয়, বরং সবার জন্য সমান সুযোগ ও ন্যায্যতা।
বিএনপির নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস স্বাভাবিক। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর নেতা ফিরছেন—এতে আবেগ থাকবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আবেগকে যদি রাজনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রিত না করা যায়, তবে প্রত্যাবর্তনের সুফল ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়বে।
তারেক রহমানের সামনে এখন সুযোগ—দলকে কেবল আন্দোলনের রাজনীতি থেকে বের করে রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার।
সর্বপরি, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই অধ্যায় সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তিনি অতীতের ভার কতটা নামিয়ে রাখতে পারেন এবং ভবিষ্যতের দায় কতটা গ্রহণ করেন তার ওপর।
দেশের রাজনীতি এখন আর প্রতীক নয়, বাস্তব সমাধান চায়। প্রশ্ন এখন একটাই—তারেক রহমান কি সেই সমাধানের রাজনীতিতে প্রবেশ করতে প্রস্তুত?