হাদির মৃত্যু ও রাষ্ট্রের দায়: ক্ষোভের রাজপথ, প্রশ্নের কাঠগড়া

শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় যোগ করল। একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীকে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যার ঘটনা শুধু একটি প্রাণহানি নয়, এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এই প্রশ্নই আজ রাজপথে ক্ষোভ হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে।
১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণা শেষে রিকশায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। ঢাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই সারাদেশে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক।
বরগুনা থেকে ফেনী, ফরিদপুর থেকে খুলনা, সিলেট থেকে ভোলা—দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। একই সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভীর রাতে প্রতিবাদে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। এই প্রতিবাদ কেবল একটি দলের কর্মসূচি নয়; এটি সমাজের ভেতরে জমে থাকা নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
এই ক্ষোভ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে—মানুষ আর কেবল আশ্বাসে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। অতীতে বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে আমরা দেখেছি, তদন্তের ঘোষণা এলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে গেছে। হাদির হত্যার পর জনগণ তাই দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়—দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে স্লোগানে উঠে এসেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নাম, বিদেশি আধিপত্যবিরোধী বক্তব্য এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের দাবি। এসব ইঙ্গিত দেয়, রাজনীতিতে সহনশীলতা ও পারস্পরিক আস্থার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন রাজনৈতিক কর্মী দিনের আলোয় গুলিবিদ্ধ হন, দিনের পর দিন চিকিৎসাধীন থাকেন, অথচ অপরাধীদের বিষয়ে যদি দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সহিংসতায় ভরপুর। কিন্তু প্রতিবার যদি এমন হত্যাকাণ্ডের পর বিচার নিশ্চিত না হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর বার্তা দেয়। তরুণ প্রজন্ম তখন রাজনীতিকে আদর্শ বা সেবার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং জীবনসংহারী ঝুঁকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। হাদির মৃত্যু সেই আশঙ্কাকেই আরও গভীর করেছে।
এই মুহূর্তে হাদির মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। প্রয়োজন অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে রাজপথের ক্ষোভ আরও বিস্তৃত হবে।
হাদির মৃত্যুর পর যে প্রশ্নগুলো রাষ্ট্রের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে, সেগুলোর উত্তর দিতে হবে কাজের মাধ্যমে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে এই ক্ষোভ প্রশমিত হবে না। রাষ্ট্র যদি এবারও ব্যর্থ হয়, তবে হাদির মৃত্যু শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে নয়—রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার ভাঙনের আরেকটি মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবেই ইতিহাসে লেখা থাকবে।