সালাত নিয়ে বিভাজন ও কুরআনভিত্তিক চর্চার প্রশ্ন

ইসলামে সালাতের মৌলিক চর্চা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ ও বিভাজন বিদ্যমান। হাত নাভির নিচে না বুকে বাঁধা, ‘আমীন’ জোরে না আস্তে বলা, তারাবিহ ৮ না ২০ রাকাত—এমন নানা আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে মতপার্থক্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোথাও কোথাও তা সংঘাতেও রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিভাজন সালাতের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দিচ্ছে।
ধর্মীয় চিন্তাবিদদের একটি অংশের প্রশ্ন—যে বিষয়ে ১৪০০ বছরেও ঐকমত্য তৈরি হয়নি, সেই চর্চা দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কীভাবে অর্জিত হবে? তারা মনে করেন, ইসলামের মূল শিক্ষা বিভাজন নয়, বরং ঐক্য ও আত্মশুদ্ধি।

প্রচলিত শিক্ষায় মুসলমানদের শেখানো হয় দিনে পাঁচ ওয়াক্তে মোট ১৭ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়। তবে কুরআনের কোথাও সরাসরি এই ১৭ রাকাতের সংখ্যাগত হিসাব উল্লেখ নেই—এ বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, কুরআনে যা স্পষ্টভাবে নেই, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান কি না—এই প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কুরআনের সূরা নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সালাতে দাঁড়ালে মানুষকে জানতে হবে সে কী বলছে। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন—বেশিরভাগ মুসল্লিই না বুঝে আরবি তিলাওয়াত করেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, না-বোঝা পাঠ আদৌ ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য পূরণ করছে কি না, নাকি তা কেবল প্রথাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, সূরা আনকাবুতের ৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। বাস্তবে যদিও দেখা যায়, অনেক নিয়মিত নামাজি ব্যক্তি সুদ, দুর্নীতি কিংবা গুরুতর অপরাধে জড়াচ্ছেন। ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, লোক দেখানো বা যান্ত্রিক সালাত মানুষকে পরিবর্তন করতে পারে না—যার ইঙ্গিত পাওয়া যায় সূরা মাউনের ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে।
বর্তমানে সালাত আদায়ের পদ্ধতি নিয়েও বিভক্তি স্পষ্ট। শিয়ারা তিন ওয়াক্ত, সুন্নিরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন। আবার সুন্নিদের মধ্যেও হানাফি, শাফেয়ি ও আহলে হাদিস—এভাবে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম প্রচলিত। অথচ কুরআনে দ্বীনে দলাদলির বিরুদ্ধে স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজনের মূল কারণ হলো কুরআনের পরিবর্তে মানুষের তৈরি ব্যাখ্যা ও বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া।
তাঁরা আরও বলেন, কুরআন কোনো অসম্পূর্ণ গ্রন্থ নয়। সালাতের সময়, উদ্দেশ্য ও মৌলিক কাঠামো কুরআনেই উল্লেখ আছে। সালাত কেবল শারীরিক অনুশীলন নয়; এটি সচেতনভাবে আল্লাহর বাণী অনুধাবন ও গ্রহণ করার একটি প্রক্রিয়া।
ধর্মীয় গবেষকদের অভিমত, যে সালাত মানুষকে নৈতিকভাবে পরিবর্তন করে না এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভ্রান্তি তৈরি করে, তা আল্লাহর উদ্দেশ্য করা ইবাদতের প্রতিফলন হতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে কুরআনভিত্তিক ইসলামের দিকে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কারণ, বিশ্বাস অনুযায়ী কিয়ামতের দিন বিচার হবে আল্লাহর কিতাবের ভিত্তিতে—কোনো ব্যক্তির ফতোয়া বা মতবাদ দিয়ে নয়।
সূরা আম্বিয়ার ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
“আমি তো তোমাদের জন্য এমন এক কিতাব নাজিল করেছি যাতে উপদেশ রয়েছে। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?”
দৈএনকে/জে, আ