মিরপুর থেকে চুড়িহাট্টা, ঢাকা কি এখন মৃত্যুপুরী?

মিরপুরের গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। এই ঘটনা নতুনভাবে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে ঢাকা শহর বড় ধরনের রাসায়নিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।
পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার কেমিক্যাল ট্র্যাজেডি ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সতর্কবার্তা অবলম্বন করা হয়নি। ২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল গোডাউনের সরাসরি উচ্ছেদ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। মিরপুরের ঘটনা প্রমাণ করে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষার চেষ্টা করি নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা এখন “এটম বোমার শহর”। শহরে প্রায় ৩০–৩৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন রয়েছে, যার মধ্যে ১৫ হাজার অবৈধভাবে বাসাবাড়ির নিচতলায় বা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সংস্থা যে সুপারিশ দিয়েছে, তা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়িত হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ২৭,৬২৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, যেখানে নিহত ১০২। ২০২৪ সালে ২৬,৬৫৯টি ঘটেছিল, ১৪০ জন প্রাণ হারান। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই ১৫৪ জন অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন। এই ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, যে শুধু ঘটনার পরই আমরা সতর্ক হই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম নেই।
চুড়িহাট্টা এবং মিরপুরের ঘটনা প্রমাণ করে, আমাদের নীতি-নির্ধারকরা বাস্তবিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে করা পদক্ষেপও আদৌ যথেষ্ট নয়। বিস্ফোরণ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এখনো জরুরি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ঢাকার অলিগলিতে যেকোনো মুহূর্তে নতুন ট্র্যাজেডি ঘটে যেতে পারে।
আমাদের প্রশ্ন একটাই, কবে টনক নড়বে কর্তৃপক্ষের? সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা কতদিন পর্যন্ত অবহেলায় ঝুঁকিতে রাখা হবে? সরকার, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। কেবল প্রতিটি ঘটনার পর দুঃখ প্রকাশ নয়, বাস্তব পদক্ষেপই ঢাকা শহরকে প্রাণরক্ষাকারী শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
মিরপুরের ঘটনায় আমরা আবারও স্মরণ করলাম, সতর্ক না হলে প্রিয়জন হারানো প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে যাবে। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিক থেকে ঢাকার প্রশাসনকে অতিসতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। নইলে, এই মৃত্যুপুরীর গল্প শুধু ইতিহাসের পাতায় থাকবে না, বরং আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতায় রূপ নেবে।