মরিয়মের মৃত্যু: আপসনামার পরও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি

মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে মামলা হওয়ার পর ঘটনাটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মামলার বাদী ও নিহত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আদালতে আপসনামা দাখিল করে আসামিদের জামিনে আপত্তি না থাকার কথা বলার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
একই ঘটনায় একদিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ, অন্যদিকে বাদীর পক্ষ থেকে পরবর্তী সময়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকার বক্তব্য—দুটি বিষয়ই তদন্তের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রাথমিক সন্দেহ, পারিবারিক বক্তব্য কিংবা পরবর্তী সমঝোতা—কোনোটিই তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।
আদালতে বাদীর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, মরিয়মের মৃত্যুর পরপরই তার বাবার মনে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় মামলা করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে তিনি দাবি করেছেন, গাজী নজরুল ইসলাম বা মাকসুদা ইসলামের কোনো প্ররোচনা বা কার্যকলাপের কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি। দুই পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্কের বিষয়টিও আপসনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আপসনামার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন, মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে বাদীর এমন সমঝোতা তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি আদালতে দাবি করেছেন, বাদীর ওপর কোনো ধরনের চাপ ছিল কি না, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে। তবে এ ধরনের বক্তব্যও তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী। মামলার এজাহারে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ, আত্মহত্যার আগে সুইসাইড নোট পাওয়ার কথা এবং পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। আবার পরবর্তী আপসনামায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্ররোচনার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী তথ্যের নিরপেক্ষ যাচাই ছাড়া সত্যের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মরিয়মের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ, সুইসাইড নোটের সত্যতা, ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন—সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মৃত্যুর আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাদের বক্তব্যও যাচাই করা দরকার।
এর আগে মরিয়ম ও গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের তথ্যও সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে ভিডিও ফাঁস ও মরিয়মকে ঘিরে আরেকটি মামলাও হয়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা মরিয়মের মৃত্যুর প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে তদন্তের আওতায় আসা স্বাভাবিক।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা জনমতের চাপ—কোনোটিই তদন্তের ফলাফলের বিকল্প নয়। একইভাবে কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে দোষী ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আদালতের বিচার এবং আইনসম্মত তদন্তের মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত।
আদালত এরই মধ্যে মাকসুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করলেও গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছে। এই সিদ্ধান্তও মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। সামনে তদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়ায় আরও তথ্য প্রকাশ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মরিয়মের পরিবার আপস করেছে কি না, আসামিরা অভিযোগ অস্বীকার করেন কি না—এসবের বাইরে একজন ১৯ বছর বয়সী তরুণীর মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ জানা সবচেয়ে জরুরি। তার মৃত্যু যদি নিছক আত্মহত্যা হয়ে থাকে, সেটিও প্রমাণসহ স্পষ্ট হওয়া দরকার। আর যদি তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসতে হবে।
একজন মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব কেবল একটি পরিবারের নয়; এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং বিচারিক ব্যবস্থারও দায়িত্ব। তাই কোনো পক্ষের চাপ, আবেগ, সামাজিক প্রভাব বা আপসনামা যেন তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত না করে—সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় শেষ পর্যন্ত সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই প্রত্যাশা।