৫৬ বছর বয়সে উগান্ডার নতুন রাজা এডওয়ার্ড রুকিডি

উগান্ডার তোরো রাজ্যের নতুন রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা। ৫৬ বছর বয়সী এই রাজা ‘এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা নায়াবোঙ্গো প্রথম’ নামে সিংহাসনে বসেছেন। রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত হলেও দীর্ঘদিন তিনি দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে সাংবাদিক, উপস্থাপক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন।
তোরো উগান্ডার স্বীকৃত চারটি ঐতিহাসিক রাজ্যের একটি। গত ৩১ বছর রাজ্যটির নেতৃত্বে ছিলেন রাজা ওইও ন্যিম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি চতুর্থ। ১৯৯৫ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী রাজাদের একজন হিসেবে পরিচিতি পান। গত মাসে ৩৪ বছর বয়সে ক্যানসারে তার মৃত্যু হয়।
নতুন রাজার অভিষেক ঘিরে তোরো রাজ্যে দিনটি ঐতিহ্যবাহী নানা আনুষ্ঠানিকতায় উদযাপন করা হয়েছে। মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া বিভিন্ন রাজকীয় রীতির অংশ হিসেবে কিজানাঙ্গোমাকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে কারুজিকা রাজপ্রাসাদে যেতে হয়। তোরো রাজ্যের তথ্যবিষয়ক মন্ত্রী চার্লস মওয়াঙ্গুহিয়া বিবিসিকে জানান, অভিষেকের পর প্রতীকী লড়াইয়ের আয়োজন করা হবে। এর মাধ্যমে বোঝানো হবে, রাজত্ব অর্জন সহজ নয়। পরে রাজপরিবারের বাবিতো গোত্রের সদস্যরা নতুন রাজাকে আশীর্বাদ করবেন।
তবে নতুন রাজার সিংহাসনে বসার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। তোরো রাজপরিবারের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, প্রয়াত রাজার স্বীকৃত কোনো পুত্র থাকলে তারই উত্তরসূরি হওয়ার কথা। রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্যের দাবি, রাজা ওইও একটি পুত্রসন্তান রেখে গেছেন এবং তার লিখিত ইচ্ছাপত্রে ওই সন্তানকে পরবর্তী রাজা করার নির্দেশ ছিল।
কিন্তু ওই সন্তানকে কখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি। এমনকি রাজা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা বাবিতো গোত্রের ২১ সদস্যের কমিটিও তাকে উত্তরসূরি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। প্রয়াত রাজা ওইও প্রকাশ্যে কখনো বিয়ে করেননি এবং তার স্ত্রী বা সন্তানের বিষয়ে খুব কম তথ্যই জানা যায়।
ওইওর মা রানি বেস্ট কেমিগিসা অবশ্য তার ছেলের ইচ্ছাপত্রকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু রাজা নির্বাচনের কমিটি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তাদের সিদ্ধান্ত তোরো রাজ্যের প্রচলিত রীতি ও ঐতিহ্য মেনেই নেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে কেমিগিসা ও তার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের সঙ্গে রাজপরিবারের অন্য অংশের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। কেমিগিসা কিজানাঙ্গোমার নির্বাচনকে ‘দ্বিতীয় রাজা ঘোষণার’ সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ওইওর ইচ্ছাপত্র পরিবারের সদস্যদের পড়ে শোনানোর পরই নতুন রাজা ঘোষণার বিষয়টি সামনে আসে।
বিবিসিকে তিনি বলেন, ছেলের মরদেহ যেখানে রাখা ছিল, তার মাত্র কয়েক মিটার দূরে পরবর্তী রাজাকে ঘিরে উদযাপন শুরু হওয়া একজন মা হিসেবে তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের ছিল।
কেমিগিসা আরও জানিয়েছেন, তার নাতি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ছিলেন এবং দেশে ফেরার কথা থাকলেও উত্তরাধিকার নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, কোনো শিশুকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা উচিত নয়, যেখানে বাবার দেশে ফিরে আসা তাকে বিরোধ ও সংঘাতের মধ্যে টেনে নিতে পারে।
তবে তোরো রাজ্যের তথ্যবিষয়ক মন্ত্রী চার্লস মওয়াঙ্গুহিয়ার দাবি, আলোচনায় থাকা ওই সন্তানকে কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তার ভাষ্য, এ কারণে রাজা ওইও কোনো পুত্রসন্তান রেখে গেছেন—এমন দাবির বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতা কমছে।
মওয়াঙ্গুহিয়া জানান, এবারের উত্তরাধিকার একই পারিবারিক শাখায় না গিয়ে শাসক গোত্রের অন্য একটি ধারায় গেছে। রাজপ্রাসাদের সূত্র অনুযায়ী, তোরোর রাজা অবশ্যই বাবিতো গোত্রের সদস্য হতে হবে এবং রাজা জর্জ ডেভিড ম্যাথিউ কামুরাসি রুকিডি তৃতীয়ের বংশধারার হতে হবে।
কিজানাঙ্গোমা ও প্রয়াত রাজা ওইও পরস্পরের চাচাতো ভাই। তারা দুজনই রুকিডি তৃতীয়ের নাতি। রুকিডি তৃতীয় ১৯২৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তোরো রাজ্যের রাজা ছিলেন।
রাজা নির্বাচনের জন্য কিজানাঙ্গোমার পাশাপাশি আরও কয়েকজনের নাম বিবেচনায় ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্স জর্জ ডেসমন্ড কামুরাসি, যিনি যুক্তরাজ্যের একটি পরিচিত অপেশাদার ফুটবল ক্লাবে খেলেন। রাজা নির্বাচনের কমিটির দাবি, অন্যান্য দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি সিংহাসনের প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
রাজা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর কিজানাঙ্গোমা বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য রাজপ্রাসাদের দরজা খোলা থাকবে। তিনি ঐক্য ও উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান।
তিনি বলেন, “তারা আমাকে রাজা হিসেবে এই দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু আমি একা কাজ করতে পারব না। আমাকে আপনাদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হবে।”
উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী রাজাদের কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। তবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। দেশটির চারটি প্রধান ঐতিহাসিক রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী হলো মধ্যাঞ্চলের বুগান্ডা রাজ্য, যার আওতায় রাজধানী কাম্পালাও রয়েছে।
১৯৬৭ সালে উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী রাজতন্ত্রগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছিল। পরে প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনির সরকারের সময়ে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সেগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এর উদ্দেশ্য হিসেবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় ঐক্যকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের মধ্যেই উগান্ডা সরকার বাবিতো গোত্রের নির্বাচিত কিজানাঙ্গোমাকে সমর্থন করেছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল স্যাম মায়াঞ্জা বলেন, তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ না থাকায় তোরো রাজ্যকে অভিষেক আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের ঘোষিত তারিখ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট মুসেভেনিও উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্টের ছেলে ও দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান মুউহুজি কাইনেরুগাবাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিজানাঙ্গোমাকে সমর্থন জানিয়ে তার দীর্ঘ রাজত্ব কামনা করেছেন।
কিজানাঙ্গোমার নামের সঙ্গেও তোরোর রাজপরিবারের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তার বাবা, যিনি প্রথম কিজানাঙ্গোমা নামে পরিচিত, রুকিডি তৃতীয় সিংহাসনে বসার বছর জন্মগ্রহণ করেন। রাজা তাকে ‘কিজানাঙ্গোমা’ নাম দেন, যার অর্থ ‘যিনি রাজকীয় ঢোল নিয়ে আসেন’।
১৯৭০ সালে জন্ম নেওয়া কিজানাঙ্গোমা ফোর্ট পোর্টালের প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের কিদুকুরু গ্রামে বেড়ে ওঠেন। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম ছাড়েন এবং ১৯৯৯ সালে উগান্ডার খ্যাতনামা মাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।
এরপর সম্প্রচার সাংবাদিকতায় তার দীর্ঘ কর্মজীবন শুরু হয়। দুই দশকেরও বেশি সময় তিনি সাংবাদিকতা ও সম্প্রচারমাধ্যমে কাজ করেছেন। প্রতিবেশী রুয়ান্ডার পাশাপাশি নিজ দেশ উগান্ডার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা ইউগান্ডা ব্রডকাস্টিং করপোরেশনেও (ইউবিসি) তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও নেতাদের সঙ্গে কাজ এবং জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন নতুন দায়িত্ব পালনে তাকে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজা ঘোষণার পর কিজানাঙ্গোমা বলেন, সাংবাদিক হিসেবে ২১ বছরে গড়ে ওঠা তার যোগাযোগ ও সম্পর্ককে তোরোর মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান।
তার মা আসিমওয়ে ইউস্তা কিজানাঙ্গোমার বিশ্বাস, ঐতিহ্যনির্ভর পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তার ছেলে নতুন দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত। বিবিসিকে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি ছেলেকে তোরো রাজ্যের পুরোনো রীতি, শাসন ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি তাকে পুরোনো রাজ্যের শিক্ষা, শাসন ও নির্দেশনার মধ্যেই বড় করেছি। কখনো তার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করেছি, আবার কখনো শাসনও করেছি।”
ছেলের স্বভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, “এডি ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের। সে মারামারি করে না, চিৎকারও করে না। কেউ তার সঙ্গে অন্যায় করলেও অল্প কিছু কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যায়।”
ছেলের রাজা হওয়ার ঘটনায় আনন্দের পাশাপাশি প্রয়াত রাজা ওইওর মৃত্যুর পর নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় তার মধ্যে মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে বলেও জানান তিনি।