যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে অগ্রগতি নেই: ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী চুক্তি পুনরায় কার্যকর করা এবং এর প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্যের মধ্যেই শান্তি আলোচনার এই অচলাবস্থার খবর সামনে এসেছে।
অন্তর্বর্তী চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল। এতে দুই পক্ষের সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে চুক্তিটি বেশিদিন টেকেনি।
৭ জুলাই ট্রাম্প চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করেন। পরে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চুক্তিটি স্থগিত রয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। অন্যদিকে তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার ও আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে।
ইরানের ওই কর্মকর্তা জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
হরমুজ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
বুধবার ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তবে ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নৌপথটি এখনো বন্ধ এবং ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তা পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আগের প্রভাব আর নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রাম্প কখনো সংঘাত আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন, আবার কখনো দ্রুত শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। ফলে তার বক্তব্য নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
৬০ দিনের সময়সীমা নিয়েও বিরোধ
জুনের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পারস্পরিক সম্মতিতে তা বাড়ানোর সুযোগও ছিল। এই সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা ছিল।
তবে তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে ৬০ দিনের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতির কথা বলা হয়। ইরানের ওই কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তার ভাষ্য, ইরানের দৃষ্টিতে ওই সময়সীমা কার্যকরভাবে শুরুই হয়নি। তাই সেটি বাড়ানোর প্রশ্নও আসে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী চুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করে এবং কয়েক দিনের মধ্যে চুক্তি থেকে সরে যায়।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বেড়েছে। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠে যায়, যা সংঘাত শুরুর আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় অনিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স