কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, নিহত ১৮০ ছাড়িয়েছে

কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে।
সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে পশ্চিম কলম্বিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। কয়েক শ মাইলজুড়ে কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের পর মঙ্গলবারও বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
সরকারিভাবে নিহতের সংখ্যা ১৮১ জন বলা হলেও স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে কালি ও পেরেইরা। প্রেসিডেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মানুষ আহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২০০ জন। এ ছাড়া ১ হাজার ১০০টির বেশি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং ৮ হাজারেরও বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পেরেইরায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। শহরের দমকল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের সন্ধানে শত শত উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন।
ভূমিকম্পের পর অনেক মানুষ বাড়িঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়িঘর ধসে যাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। আবার অনেকেই পরবর্তী কম্পনে ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কায় ঘরে ফেরেননি।
২২ লাখ মানুষের শহর কালিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে উদ্ধার অভিযান সমন্বয়ের জন্য যৌথ কমান্ড পোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। শহরের মেয়র আলেহান্দ্রো এদের জানিয়েছেন, কয়েক শত মানুষ ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত মানুষ এবং বহু ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে।
কালির একটি হাসপাতালের ওপরের কয়েকটি তলা ধসে পড়েছে। ধসে পড়া অংশের একটি অংশ শিশুদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হতো। এতে কয়েকজন রোগী আটকা পড়েছেন। শহরের উত্তরের ক্যালিমা এলাকায় একটি স্কুলের অংশ ধসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আহত আরও কয়েকজন শিশুকে চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর লুটপাটের আশঙ্কায় কালি শহরে রাতের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এ নির্দেশ কার্যকর থাকার কথা।
কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মূল ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে ৭০টির বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। মঙ্গলবার ভোরেও কয়েকটি কম্পন রেকর্ড করা হয়। আরও আফটারশকের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মানিসালেস শহরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শহরের মেয়রের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৬০টি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের যাচাই না করা তথ্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক না বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা ও ত্রাণ কার্যক্রমও চলছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আছেন কি না, তা শনাক্ত করতে উদ্ধারকারীরা বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দেশটির জনগণ ও সরকারের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে মানুয়েল আলবারেস জানিয়েছেন, দেশটির ১৬৪ নাগরিকের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের মধ্যে কেউ নিহত বা আহত হয়েছেন—এমন তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
কলম্বিয়ার জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও এসেছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে। যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৫৫ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া ইকুয়েডর, ব্রাজিল, এল সালভাদর ও ভেনেজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই হতাহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।