ট্রাম্প প্রশাসনে বড় পরিবর্তন, প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ছেন লেভিট

পরিবারকে আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। চলতি আগস্ট মাসের শেষেই তিনি প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবে পদ ছাড়লেও ট্রাম্পের প্রধান পরামর্শদাতাদের একজন হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন তিনি।
বুধবার (১২ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় লেভিটের দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেভিটের প্রশংসা করে বলেন, ২০১৮ সাল থেকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মুক্তির পক্ষে কাজ করে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
ট্রাম্প জানান, প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ার পরও লেভিট তার অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত থাকবেন। পাশাপাশি রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।
সবচেয়ে কম বয়সী প্রেস সেক্রেটারি
২৭ বছর বয়সে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন ক্যারোলিন লেভিট। তিনিই এখন পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করা সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তি।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রেস সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন লেভিট। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চারজন এই দায়িত্বে ছিলেন। তাদের মধ্যে সাবেক প্রেস সেক্রেটারি শন স্পাইসার এবং বর্তমানে আরকানসাসের গভর্নর সারাহ হাকাবি স্যান্ডার্সও রয়েছেন।
লেভিটের পদত্যাগের ঘোষণা আসে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে দায়িত্বে ফেরার অল্প সময়ের মধ্যেই। চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে তিনি ও তার স্বামী নিকোলাস রিচিও দ্বিতীয় সন্তানের বাবা-মা হন। তাদের মেয়ের নাম ভিভিয়ানা।
এর আগে এপ্রিলের শেষ দিকে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান লেভিট। জুলাইয়ের মাঝামাঝি হোয়াইট হাউসের পডিয়ামে ফিরে এসে বিরতির পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ ব্রিফিং করেন তিনি।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লেভিট
ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের শুরু থেকেই তার ঘনিষ্ঠ বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লেভিট। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্টের চিঠিপত্রবিষয়ক দপ্তরে ইন্টার্ন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ও সহকারী প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন লেভিট। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সুপার প্যাক ‘মাগা ইনক’-এ যোগাযোগবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
এরপর ২০২১ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। রিপাবলিকান দলের প্রাথমিক নির্বাচনে জয় পেলেও ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও বর্তমান কংগ্রেস সদস্য ক্রিস পাপ্পাসের কাছে পরাজিত হন।
২০২৪ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার শুরু করলে লেভিট তার অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে প্রচারে যুক্ত হন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ২০২৫ সালে তাকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি নিয়োগ করেন।
বিতর্কিত হলেও ট্রাম্পের প্রশংসা পেয়েছেন
হোয়াইট হাউসের প্রেস ব্রিফিংয়ে লেভিটের বক্তব্যের ধরন ছিল বেশ আক্রমণাত্মক। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে একাধিকবার তার তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতি ও ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে জড়িয়েছেন।
এক পর্যায়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক সাংবাদিককে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত এবং তার অর্থনৈতিক জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলা তার কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে।
লেভিটের নেতৃত্বে হোয়াইট হাউসের নিয়মিত ব্রিফিংয়েও কিছু পরিবর্তন আনা হয়। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি ব্লগার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন ‘নিউ মিডিয়া’ প্রতিনিধিদের সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়।
সাধারণত ব্রিফিংয়ের শুরুতেই ‘নিউ মিডিয়া চেয়ার’-কে প্রশ্ন করার সুযোগ দিতেন লেভিট। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, এই সুযোগের বড় অংশই ডানপন্থি কনটেন্ট নির্মাতাদের দেওয়া হতো।
তবে লেভিট এই নীতিকে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের নতুন ধরনের গণমাধ্যম কৌশলের ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস শুধু প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নয়, বরং সব ধরনের গণমাধ্যম ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।
প্রশাসন থেকে একের পর এক বিদায়
লেভিটের পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনে সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার বিদায়ের ধারাবাহিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর আগে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি ও সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েমকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক শ্রমমন্ত্রী লরি মিশেল শ্যাভেজ-ডিরেমার এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান টড লায়নও নেতৃত্ব নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন।
তবে লেভিটের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। দায়িত্ব ছাড়ার পরও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সাফল্য নিশ্চিত করতেও তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।