মেসির জীবনের সবচেয়ে আবেগের গল্প, ‘বাবাকে জড়িয়ে ধরতে চাইতাম’

লিওনেল মেসির জীবনে ফুটবল ছিল স্বপ্ন, সাফল্য ও পরিচয়ের বড় অংশ। তবে এই ফুটবলারের কাছে পরিবারের গুরুত্ব ছিল আরও গভীর। সেই পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন তার বাবা হোর্হে মেসি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ৬৮ বছর বয়সে তার মৃত্যুতে মেসির জীবনের নানা পুরোনো স্মৃতি আবারও সামনে এসেছে।
মাঠে মেসির সাফল্য থেকে শুরু করে কঠিন সময়—সবকিছুতেই কোনো না কোনোভাবে পাশে ছিলেন হোর্হে। মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের পথচলায় বাবার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাবা-ছেলের সম্পর্ক শুধু ফুটবলকেন্দ্রিক ছিল না; এর মধ্যে ছিল গভীর আবেগ ও ভালোবাসা।
২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার আগে এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক গাস্তোন রেকোন্দো মেসিকে তার বাবার বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। সেই প্রশ্নের জবাবে মেসি হোর্হের সঙ্গে তার সম্পর্কের যে ছবি তুলে ধরেছিলেন, বাবার মৃত্যুর পর সেটিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মেসি জানিয়েছিলেন, তার বাবা ফুটবলকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ছেলে ফুটবল খেলছেন—এটি উপভোগ করার পাশাপাশি খেলা নিয়ে মেসির সঙ্গে আলোচনা করতেও পছন্দ করতেন হোর্হে। বার্সেলোনা কিংবা আর্জেন্টিনার ম্যাচ—সবকিছু নিয়েই বাবা-ছেলের মধ্যে কথা হতো।
মেসির ভাষায়, তার বাবা ফুটবল খুব ভালোবাসতেন এবং বিশেষ করে ছেলের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করতেন। মেসির খেলা, বার্সেলোনার ম্যাচ কিংবা জাতীয় দলের পারফরম্যান্স—এসব ছিল তাদের আলোচনার অন্যতম বিষয়।
তবে বাবাকে নিয়ে মেসির সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতিগুলো ফুটবলের বাইরের জীবন ঘিরে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতে পারতেন না তিনি। হোর্হে ভোররাতেই কাজে বেরিয়ে যেতেন এবং রাতের খাবারের সময় বাড়ি ফিরতেন।

মেসি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তার বাবা ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন এবং প্রতিদিন রাত ৯টার দিকে বাড়ি ফিরতেন। ফলে সারাদিন বাবার সঙ্গে দেখা হতো না। যখনই বাবার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেতেন, সেটিই মেসির কাছে ছিল বিশেষ কিছু।
শৈশবের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে মেসি জানিয়েছিলেন, বাবা কখনো তার ওপর চিৎকার করতেন না। বরং বাবাকে তিনি খুব মিস করতেন। প্রতিদিন বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতেন—কখন তিনি ফিরবেন এবং কখন তাকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন, সেই অপেক্ষাই ছিল তার কাছে আনন্দের।
নিজের সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের কথাও সেই সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছিলেন মেসি। থিয়াগো, মাতেও ও সিরোর সঙ্গে তিনি দিনের অনেকটা সময় কাটাতে পারতেন। সকালে অনুশীলন শেষে সন্তানদের সময় দিতেন, আবার ম্যাচ খেলতে বাইরে গেলেও ফিরে এসে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করতেন।
বাবার শৈশবের সঙ্গে নিজের পিতৃত্বের এই জায়গাটিতেই পার্থক্য দেখেছিলেন মেসি। তিনি চেয়েছিলেন, নিজের সন্তানদের বড় করার সময় তাদের আরও বেশি সময় দিতে এবং তাদের পাশে থাকতে।

বাবার প্রতি মেসির ভালোবাসার সবচেয়ে স্মরণীয় উদাহরণগুলোর একটি ২০০৮ সালের একটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ। উরুগুয়ের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ ব্যবধানের জয়ে গোল করেছিলেন মেসি। গোল করার পর জার্সি তুলে ভেতরের টি-শার্টে লেখা একটি বার্তা দেখিয়েছিলেন তিনি—‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, বাবা।’
সেই সময় হোর্হে মেসি কঠিন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। বাবা ফুটবল কতটা ভালোবাসেন, তা মেসি জানতেন। তাই গোলের পর সেই মুহূর্তটিকে বাবার উদ্দেশে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি।
পরে মেসি জানিয়েছিলেন, তার বাবার কঠিন সময়ের মধ্যে পাশে থাকার অন্যতম উপায় হিসেবে তিনি ওই উদযাপনটি করেছিলেন। তিনি জানতেন, বাবা তাকে খেলতে দেখতে কতটা ভালোবাসেন এবং তার খেলা নিয়ে কতটা আবেগ অনুভব করেন। তাই গোলের মুহূর্তে বাবাকে দেওয়া সেই বার্তাকে তিনি একটি বিশেষ উপহার হিসেবে দেখেছিলেন।
মজার বিষয় হলো, মেসির এমন উদযাপনের কথা আগে থেকে জানতেন না হোর্হে। মেসি সাধারণত গোল করার পর খুব বেশি উদযাপন করতেন না কিংবা কাউকে আলাদা করে গোল উৎসর্গও করতেন না। ফলে জার্সির নিচে লুকিয়ে রাখা সেই বার্তাটি ছিল বাবার জন্য একেবারেই বিশেষ একটি চমক।
আজ হোর্হে মেসি আর নেই। কিন্তু লিওনেল মেসির জীবনের অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে তিনি চিরকাল জড়িয়ে থাকবেন। মাঠে গোল করার পর বাবাকে দেওয়া ভালোবাসার সেই বার্তা, ম্যাচ শেষে বাবার মতামত জানার আগ্রহ কিংবা শৈশবে রাত ৯টায় বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষা—সবকিছুতেই থেকে যাবে বাবা-ছেলের গভীর সম্পর্কের গল্প।
ফুটবল বিশ্ব মেসিকে কিংবদন্তি হিসেবে মনে রাখবে। কিন্তু বাবার স্মৃতিতে তিনি হয়তো সবসময় সেই ছোট্ট ছেলেটিই থাকবেন, যে সারাদিন পর বাবার বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করত শুধু একবার তাকে জড়িয়ে ধরার জন্য।