নতুন প্রেসিডেন্টের শপথের পরদিন কলম্বিয়ায় গাড়িবোমা হামলা

নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলর্দো দে লা এস্প্রিয়েলা দায়িত্ব নেওয়ার একদিনের মধ্যেই বড় ধরনের সহিংসতার মুখে পড়েছে কলম্বিয়া। শনিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কাউকা বিভাগে একটি টোল প্লাজায় গাড়িবোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
দেশটির পশ্চিম উপকূলের প্যান-আমেরিকান হাইওয়ের একটি টোল প্লাজায় শক্তিশালী বিস্ফোরণটি ঘটে। কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সাবেক গেরিলা সংগঠন ফার্কের বিচ্ছিন্ন দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই হামলার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এক ব্যক্তি একটি গাড়ি টোল প্লাজার কাছে রেখে দ্রুত সেখান থেকে সরে যান। পরে তিনি মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এর কিছুক্ষণ পরই গাড়িটিতে বিস্ফোরণ ঘটে।
হামলায় টোল প্লাজার দুই নিরাপত্তাকর্মী সামান্য আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকায়ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নতুন সরকার। কলম্বিয়ার যোগাযোগ ও পরিবহনমন্ত্রী এলসা নোগুয়েরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, সহিংসতার কাছে সরকার মাথা নত করবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও কোনোভাবেই ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না।
প্রেসিডেন্টের অভিষেক ভাষণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সময় শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
এর মাত্র একদিন আগে শুক্রবার জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন আবেলর্দো দে লা এস্প্রিয়েলা। নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছিলেন।
তার রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল বিদ্রোহী ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ‘লৌহ মুষ্টি’ নীতি গ্রহণ। ক্ষমতায় আসার পর তিনি সাবেক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ‘সামগ্রিক শান্তি’ নীতিও বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন।
২০১৬ সালে কলম্বিয়া সরকারের সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি করে ফার্কের বড় অংশ অস্ত্র সমর্পণ করে এবং রাজনীতিতে ফিরে আসে। তবে সংগঠনটির কিছু বিচ্ছিন্ন অংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে এখনো সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
নতুন প্রেসিডেন্টের নীতির সঙ্গে সাবেক সরকারের অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। গুস্তাভো পেত্রো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। পাশাপাশি কোকা চাষিদের অবৈধ চাষ থেকে সরিয়ে বিকল্প ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করার নীতিও নিয়েছিলেন তিনি।
তবে দে লা এস্প্রিয়েলার মতে, বিদ্রোহী ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনার পথ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তার সরকারের কাছে এখন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মাদক কারবার দমন করাই প্রধান কৌশল।
জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিদায়ী বামপন্থী সরকারের সমর্থিত প্রার্থী ইভান সেপেদাকে এক শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন দে লা এস্প্রিয়েলা।
নতুন সরকারের কঠোর নিরাপত্তানীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনও রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দে লা এস্প্রিয়েলার নেতৃত্বকে সমর্থন জানিয়ে কলম্বিয়ার জন্য ১০০ কোটি ডলারের নতুন নিরাপত্তা সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পরামর্শে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন উড়োজাহাজ ও নৌযানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও করছে কলম্বিয়া। প্রয়োজনে সরাসরি হামলার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
তবে সরকারের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, বিদ্রোহী ও মাদক কার্টেল দমনে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গাড়িবোমা হামলার ঘটনা তাই নতুন সরকারের নিরাপত্তানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটিতে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।