কপ-৩১: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে—তুরস্কে জলবায়ু কূটনীতির নতুন পরীক্ষা
.jpg)
বিশ্ব এখন জলবায়ু সংকটের এক অভূতপূর্ব সময় অতিক্রম করছে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে, অন্যদিকে বন্যা, খরা, দাবানল, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় মানবসভ্যতার জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েই আগামী ৯–২০ নভেম্বর ২০২৬ তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩১তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (COP31)।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য “Dialogue. Consensus. Action.”—বাংলায় “সংলাপ, ঐকমত্য ও পদক্ষেপ”। এই তিনটি শব্দ শুধু একটি স্লোগান নয়; বরং বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন। কারণ, গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অসংখ্য আন্তর্জাতিক আলোচনা, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি গৃহীত হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে কপ-৩১ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতিশ্রুতির রাজনীতি থেকে বাস্তবায়নের রাজনীতিতে
১৯৯২ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) গৃহীত হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর কপ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি ছিল বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির অন্যতম বড় অর্জন, যেখানে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ এখনও পর্যাপ্ত হারে কমেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্গমন বৃদ্ধি পেয়েছে। উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়নের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বাস্তবায়নও প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। ফলে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে কপ-৩১-এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে—*প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া*। অর্থাৎ, আলোচনার টেবিলে গৃহীত সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবে কার্যকর হয়েছে, তা মূল্যায়ন করা এবং বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো।
কেন তুরস্ক?
তুরস্ক ভৌগোলিকভাবে ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। একই সঙ্গে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্কে তাপপ্রবাহ, দাবানল, খরা এবং পানিসংকটের ঘটনা বেড়েছে। ফলে দেশটি জলবায়ু অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
আন্তালিয়াকে কপ-৩১-এর আয়োজক শহর হিসেবে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তুরস্ক একটি প্রতীকী বার্তাও দিতে চায়—জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য—সব অঞ্চলের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
‘Dialogue. Consensus. Action.’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কপ-৩১-এর মূল প্রতিপাদ্য তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সংলাপ (Dialogue): জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সক্ষমতা উন্নয়নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা ছাড়া কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
ঐকমত্য (Consensus): জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ফলে বিভিন্ন দেশের স্বার্থ ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছানোই কপ-৩১-এর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
পদক্ষেপ (Action): আগের সম্মেলনগুলোর মতো শুধু ঘোষণা নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করাই এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
জলবায়ু অর্থায়ন: সবচেয়ে বড় বিতর্ক
কপ-৩১-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হবে *জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance)। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তারা তুলনামূলকভাবে কম দায়ী হলেও এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার তারাই। অথচ অভিযোজন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন তারা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে সহজ শর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। কপ-৩১-এ এই দাবি আরও জোরালোভাবে উত্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ: ক্ষতির দায় কে নেবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু কূটনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় Loss and Damage বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা খরার কারণে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তার জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এই তহবিলের উদ্দেশ্য। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে এই তহবিল কার্যকর করার দাবিতে সোচ্চার। কপ-৩১-এ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে এই তহবিলের অর্থ বিতরণের কার্যকর ও স্বচ্ছ কাঠামো নিশ্চিত করা।
জাস্ট ট্রানজিশন: উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর জরুরি। কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে যাতে শ্রমিক, নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী কিংবা উন্নয়নশীল অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করাই Just Transition-এর মূল দর্শন। বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে শিল্পায়ন এখনও বিকাশমান, সেখানে জাস্ট ট্রানজিশন শুধু পরিবেশগত নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন একটি অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা, উপকূলীয় ক্ষয় এবং জলাবদ্ধতার কারণে লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় কপ-৩১ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ।
বাংলাদেশের আলোচনার মূল বিষয় হতে পারে—অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি, লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল কার্যকর করা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, সক্ষমতা উন্নয়ন, উপকূলীয় সুরক্ষা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের স্বীকৃতির প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কপ-৩১-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থকে সামনে রেখে শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
(চলবে—পরবর্তী অংশে থাকছে বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর প্রস্তুতি, কপ-৩১-এ সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব, বাংলাদেশের কৌশল, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং সম্মেলনের সম্ভাব্য ফলাফল।)