রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • একাধিক কর্মসূচি নিয়ে মহেশখালীর পথে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে—তুরস্কে জলবায়ু কূটনীতির নতুন পরীক্ষা শহীদ ও আহত ১০ পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি দিলেন প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার উপ-অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে হাইকমিশনারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ‘পচা’ শেয়ারেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, ডিএসইতে বড় উত্থান ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি বিমান চলাচল শুরু তীব্র খরায় বদলে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের চেনা প্রাকৃতিক দৃশ্য রোববার প্রথমবার চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতায় ভারতের দায় রয়েছে: সালাহউদ্দিন জাহাজ চলাচলে চীনের নির্দেশ, কড়া প্রতিবাদ তাইওয়ানের
  • হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতায় ভারতের দায় রয়েছে: সালাহউদ্দিন

    হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতায় ভারতের দায় রয়েছে: সালাহউদ্দিন
    ছবি : সংগৃহীত
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    দিল্লিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন, এর দায় ভারত এড়িয়ে যেতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

    শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দল ও ইউট্যাব আয়োজিত ‘জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে এ সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে।

    তিনি বলেন, ভারত যদি শেখ হাসিনাকে দেশটিতে বসে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেয় এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশা করে, তাহলে দুটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না।

    সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যদি বলা হয় যে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ভারত সমর্থন করে না, তাহলে বাংলাদেশ সেই অবস্থানকে স্বাগত জানায়। কিন্তু একই সঙ্গে শেখ হাসিনার মতো একজন সাবেক রাজনৈতিক নেতাকে ভারতে অবস্থান করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের।

    তিনি আরও বলেন, দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের বিরুদ্ধে এবং দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় ভারত এড়িয়ে যেতে পারে না।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে দেখা যেতে পারে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

    জুলাই গণঅভ্যুত্থান ৩৬ দিনের আন্দোলন নয়

    জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনকে শুধু ৩৬ দিনের আন্দোলন হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসকে অস্বীকার করা হবে। ৫ আগস্টের অর্জন দীর্ঘ ১৭ বছরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রামের ফল।

    তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তাই শুধু ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে ১৭ বছরের আন্দোলনের ইতিহাস মূল্যায়ন করা রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্বতার পরিচয়।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে আনা। এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিপ্লব নয়; বরং ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

    জুলাইয়ের কৃতিত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা নয়

    সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাইয়ের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হওয়া উচিত নয়। ‘জুলাই কার’—এমন প্রতিযোগিতা শুরু হলে শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ের অর্জনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

    তার মতে, প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য, কৃতিত্বের মালিকানা নেওয়ার জন্য নয়।

    তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ ও আহতদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত হলো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, সংসদে বিতর্ক হবে এবং মাঠে রাজনৈতিক কর্মসূচিও থাকবে। তবে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যা আবার স্বৈরাচারী রাজনীতির প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করে।

    হামলা নয়, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ

    বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

    তিনি বলেন, কেউ গালি দিলে তার জবাব গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দিতে হবে। প্রতিবাদ করা যাবে, কিন্তু হামলা করা যাবে না। হামলার রাজনীতি অব্যাহত থাকলে তা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।

    তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের এমন কোনো পরিস্থিতিতে জড়ানো উচিত নয়, যেখানে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে মতপ্রকাশ, সমালোচনা ও প্রতিবাদের অধিকার থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখাও জরুরি।

    অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে বক্তব্য

    আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও বক্তব্য দেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে হয়েছিল। সে সময় সংবিধানের কয়েকটি বিধানের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও পরবর্তী সময়ে সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সময়ের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন ক্রান্তিকাল তুলে ধরে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে দেশের গণতন্ত্র সংকটে পড়েছে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টা হয়েছে। ১৯৯০ সালের আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

    জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকার দাবি

    জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোকে বিভিন্ন পর্যায়ে এতে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমদিকে রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়া আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা বলা হলেও ১৬ জুলাই আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    তার দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের যোগাযোগ ছিল। বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ নিজেদের পরিচয় আড়ালে রেখে আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিল। পরে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে আন্দোলন আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

    শহিদদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্দোলনে মানুষের জীবন দেওয়ার প্রস্তুতি তৈরি হয়ে গেলে সেটি দমন করা কঠিন। তাই শুধু বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।

    প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর করার প্রস্তাব

    রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে সংসদীয় পদ্ধতির মধ্যেও কোনো স্বৈরাচারী নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারে।

    এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাবের কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেন।

    রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংসদের উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। সংবিধান কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়; সময়ের সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সংবিধান সংশোধন করা হয়।

    গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের ওপর গুরুত্ব

    সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকা।

    তার মতে, বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ ও বিতর্ক থাকবে। কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। এই ঐক্যে ফাটল তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শক্তি সেই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে।

    তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচারী রাজনৈতিক শক্তি যাতে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসে গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সে জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ