রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক, তবে এখনই খুলছে না: ইরান

হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক, তবে এখনই খুলছে না: ইরান
ছবি : সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে ওমান। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছে মাসকাট।

তবে আলোচনায় চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালি দ্রুত বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছে ইরান। প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

শনিবার ইরান ও ওমানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান আলোচনার অগ্রগতির কথা জানানো হয়। আব্বাস আরাঘচি বলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে কবে নাগাদ চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো চুক্তি হলেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে—বিষয়টি এমন নয়। প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত বেশ কিছু শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা না চালানোর জন্য ইরানকে সতর্ক করেছে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি বাহিনী প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা নৌ-অবরোধ অব্যাহত রেখেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে ওমান। তাদের লক্ষ্য, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন নৌ চলাচলের জন্য একটি সমঝোতায় পৌঁছানো।

তবে তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। ইরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা এবং স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছিল, পরবর্তী সামরিক হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটন তা লঙ্ঘন করেছে।

ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে তার ওই পদক্ষেপের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি ওয়াশিংটনকে আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করার বিষয়টি তেহরান বিবেচনা করবে না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি।

ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাকের জুলকাদর দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার আচরণ সংশোধন না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু হবে না।

তিনি জানান, জলপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ছয়টি দাবি পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করা, দেশটির বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া।

অন্যদিকে, স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে আবারও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার বিষয়ে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। শনিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, তবে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে আলোচনার মাঝপথে রয়েছে। মার্কিন জনগণের জন্য সর্বোত্তম ফলাফল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক—বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়টিকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি নৌ চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে।

তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর আগে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যে পরিমাণ তেল উত্তোলন করা হতো, ভবিষ্যতেও সেই মাত্রায় তেল উত্তোলন নিশ্চিত করা হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা জানাননি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

এর আগে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও মতবিরোধের কারণে তা সফল হয়নি। প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ চলাচলের জন্য সম্ভাব্য শুল্ক আরোপ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে একজন ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল নেওয়ার দাবি করছে ইরান।

তবে এই দাবি নাকচ করে জেডি ভ্যান্স বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল আরোপের পরিকল্পনা তাদের নেই।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করা গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে ইরানের শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ভবিষ্যৎ।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন