জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি এখনও: মান্না

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত জুলাইয়ের স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ আবারও ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে জুলাইয়ের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত সমাবেশ ও গণসঙ্গীত অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, মাত্র ৪০ দিনে দেড় হাজার মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন। শেখ হাসিনা গুলি চালানোর নির্দেশ দিলেও তা কাজে আসেনি। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও গুলি চালাতে অস্বীকার করেন। শহীদরা জীবন দিয়ে দেশের ২০ কোটি মানুষের জন্য নতুন জীবনের পথ তৈরি করে গেছেন।
জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মান্না বলেন, যদি দেশের প্রতিটি মানুষের খাবার, পরনের কাপড়, চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তা থাকত, তাহলে বলা যেত জুলাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের চার কোটি শিক্ষিত মানুষ বেকার। তাদের কর্মসংস্থানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বেকারত্ব দূর করতে না পারলে দেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। একজন ব্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে তিনি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ পান। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য ও ভাগাভাগি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক বিভাগ থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করতে হবে। সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরকারের সাড়ে পাঁচ মাসের কার্যক্রমের সমালোচনা করে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো তেমন কমেনি। সরকার জনগণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে হল দখল এবং ব্যানার লাগানোকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, এসব রাজনৈতিক সংগঠন জনগণের দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে মাঠে নামেনি। ব্যানার লাগানোকে কেন্দ্র করে যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তাহলে জনগণের প্রকৃত দাবি কখন প্রতিষ্ঠিত হবে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
নাগরিক ঐক্যের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে মান্না বলেন, তার দল সরকারি দলও নয়, আবার কোনো বিরোধী জোটের অংশও নয়। সরকারের ভালো উদ্যোগে সমর্থন থাকবে, একই সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনাও করা হবে।
তিনি বলেন, কৃষকদের ঋণ মওকুফ এবং ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ ভালো। তবে সঠিক ডেটাবেজ না থাকায় প্রকৃত দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিপুল সম্পদের মালিকরাও কৃষক কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন। প্রকৃত দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যেন সরকারি সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের ভুলত্রুটি নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে মান্না বলেন, সরকারের কোনো ভুল দেখলে তার গঠনমূলক সমালোচনা করা হবে। সমালোচনার জবাবে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে তারাও পাল্টা রাজনৈতিকভাবে জবাব দেবেন।
বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে এবং সম্মানের সঙ্গে জীবন শেষ করতে পারবে। নতুন বাংলাদেশ বলতে এমন একটি কল্যাণ রাষ্ট্রকে বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল ব্যাপক মানুষের কাছে পৌঁছাবে। সেই কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, প্রেসিডিয়াম সদস্য দেলোয়ার হোসেন রাজা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মেজর (অব.) আব্দুস সালাম এবং যুগ্ম আহ্বায়ক কবির হাসান ও সাকিব আনোয়ার।
বক্তারা বলেন, জুলাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়; এটি আপামর জনতার আন্দোলন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে রাষ্ট্র সংস্কারের আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
সমাবেশ শেষে গণসঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।