তরুণ ও নারীদের চাকরির সুযোগ বাড়াতে নতুন কৌশল নিচ্ছে বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য মানসম্মত কাজের সুযোগ বাড়ানো, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও অর্থায়নে গুরুত্ব দেবে সংস্থাটি।
২০২৭ থেকে ২০৩৩ অর্থবছর পর্যন্ত সম্ভাব্য মেয়াদ সামনে রেখে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) তৈরির কাজ চলছে। এই কৌশলগত কাঠামোর আওতায় আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান—ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ), ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং মাল্টিল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সির (এমআইজিএ) কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বাসসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন সিপিএফের মাধ্যমে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগিতার ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন দেশের সবচেয়ে জরুরি উন্নয়ন অগ্রাধিকার—এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।
দেশের শ্রমবাজারের চিত্র তুলে ধরে জ্যঁ পেসমে বলেন, গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। অথচ একই সময়ে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টরের মতে, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন অংশীদারত্ব কাঠামোর প্রধান লক্ষ্য হবে কর্মসংস্থান বাড়ানো। বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর ভিত্তিতে পরিকল্পনাটি সাজানো হবে।
নতুন সিপিএফ তৈরির আগে বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করছে বিশ্বব্যাংক।
জ্যঁ পেসমে বলেন, বেসরকারি খাতে বড় পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরির পথে যেসব মৌলিক বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করার বিষয়টি নতুন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে, সেসব খাতে সহযোগিতা কেন্দ্রীভূত করা হবে।
তিনি জানান, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগে সহায়তার পাশাপাশি নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করা হবে। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য আরও বেশি এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের পরামর্শ চায় সংস্থাটি।
এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ইতোমধ্যে নতুন সিপিএফ প্রণয়নের অংশ হিসেবে পরামর্শ কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারবেন।
সাধারণ মানুষের মতামত জানতে বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় অনলাইন জরিপেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জরিপে তিনটি বিষয়ে মতামত চাওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় বিশ্বব্যাংকের কোন খাতগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান বাড়াতে কী ধরনের সংস্কার দরকার।
কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক হলো কোনো দেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কয়েক বছর মেয়াদি সহযোগিতার কৌশলগত রূপরেখা। জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে অর্থায়ন, কারিগরি দক্ষতা, গবেষণা ও অংশীদারত্বের কোন ক্ষেত্রগুলো অগ্রাধিকার পাবে, তা এ কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে নতুন সিপিএফ তৈরির প্রস্তুতি সম্পর্কে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, আসন্ন কাঠামোয় বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখতে চায় বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক চূড়ান্ত খসড়া দিলে তা পর্যালোচনা করে দেশের অবস্থান ও মতামত জানাবে ইআরডি।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের ৩৭টি প্রকল্পে মোট ১ হাজার ১২০ কোটি ডলারের সহায়তা চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে সংস্থাটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২০২২ সালে ছিল ২২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩০ কোটি ডলারে। ২০২৪ সালে ছিল ৩৩৭ কোটি ৬০ লাখ, ২০২৫ সালে ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০২৬ সালে ১৬২ কোটি ডলার।
অন্যদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মৌলিক নীতিগত বিষয়ে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই। যৌথ কর্মপরিকল্পনার আওতায় আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা হবে। গত মাসে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। সংস্থাটির অর্থায়ন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।