গ্রেড পুনর্বিন্যাস ও নতুন ঝুঁকি ভাতা চালুর সুপারিশ করবে মন্ত্রিসভা কমিটি

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডের ক্রম, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেড নিয়ে তৈরি হওয়া অসংগতি পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। বেতন গ্রেডের পুনর্বিন্যাস, নতুন ঝুঁকি ভাতা চালু এবং বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতার হার পরিবর্তনের বিষয়ে সুপারিশ করবে এ কমিটি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘কর্মচারীদের বেতন গ্রেড–ভাতা নির্ধারণ ও পরিবর্ধন–পরিমার্জনের বিষয় পর্যালোচনা কমিটি’। গত ২ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে কমিটি। কোনো কোনো পদের বেতন গ্রেড বাড়ানো বা কমানো, বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে সামঞ্জস্য আনা এবং নতুন ভাতা চালুর বিষয়ও বিবেচনা করবে তারা।
কমিটিকে সহায়তা করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং জনপ্রশাসনসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবেরাও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন। অর্থ বিভাগ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে। প্রয়োজনে কমিটি নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
তবে কমিটির সুপারিশ জমা দেওয়ার কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়েও নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি। ফলে বেতনকাঠামোর অসংগতি নিরসনে সরকারি কর্মচারীদের আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।
গ্রেডের ক্রম ও বেতন নির্ধারণে অসংগতি
সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন পদ ও পেশার কর্মীদের বেতন গ্রেড নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও কোনো কোনো পদে গ্রেডের পার্থক্য, পদমর্যাদার সঙ্গে বেতন গ্রেডের অসামঞ্জস্য এবং পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধা কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হওয়ার পর এসব সমস্যা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে দাবি করছেন কর্মচারীরা।
অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীরা এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। জ্যেষ্ঠতা, গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড ও বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের অসংগতি তুলে ধরে তাঁরা সম্প্রতি অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করেছেন।
আবেদনে ১১তম ও ১২তম গ্রেডের বেতন নির্ধারণের একটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেড এগিয়ে থাকলেও আগের বেতন সমন্বয়ের পর হিসাবের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
একজন কর্মকর্তা জানান, গত ৩০ জুন ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। আগের কাঠামোয় তাঁর বেতন বৃদ্ধি হয়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এ বৃদ্ধি যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। কিন্তু নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের কোনো ধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপে তাঁর মূল বেতন নির্ধারিত হয়েছে ৩৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, একই সময়ে ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। আগের কাঠামোয় তাঁর বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামো অনুযায়ী হিসাব করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। তবে পরবর্তী ধাপে তাঁর মূল বেতন নির্ধারিত হয়েছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। ফলে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৭০০ টাকা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।
পদোন্নতির পরও কমতে পারে আয়
কর্মচারীদের অভিযোগ, নতুন বেতনকাঠামোয় পদোন্নতি পেলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট আয় কমে যেতে পারে। তাঁদের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা। পদোন্নতি পেয়ে নবম গ্রেডে গেলে তাঁর মূল বেতন বেড়ে হয় ৫১ হাজার টাকা।
কিন্তু পদোন্নতির পর বাড়িভাড়া ভাতার হার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ৪৫ শতাংশ হওয়ায় মোট ভাতার পরিমাণ কমে যায়। দশম গ্রেডে ওই কর্মচারী বাড়িভাড়া ভাতা পেতেন ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। নবম গ্রেডে পদোন্নতির পর তা কমে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা। এতে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে পদোন্নতির পর তাঁর আয় ৬০০ টাকা কমে যায়।
উচ্চতর গ্রেড নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। কর্মচারীদের দাবি, নির্দিষ্ট সময় চাকরি পূর্ণ করার ভিত্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেতনের ব্যবধান কমে যাচ্ছে। এমনকি কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেতন জ্যেষ্ঠ সহকর্মীর চেয়ে বেশি হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।
নতুন ঝুঁকি ভাতা চালুর বিষয়ও বিবেচনায়
নতুন কমিটির কার্যপরিধিতে বেতন গ্রেডের অসংগতি নিরসনের পাশাপাশি বিভিন্ন পদের গ্রেড উন্নীত বা অবনমন এবং গ্রেডগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য নতুন ঝুঁকি ভাতা চালু এবং বিদ্যমান অন্যান্য ভাতার হার বাড়ানো বা কমানোর সুপারিশও করতে পারবে কমিটি।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর ৫ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সময় দেওয়া হয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে যাঁরা বেতন নির্ধারণ করতে পেরেছেন, তাঁরা ১ নভেম্বর জুলাই থেকে হিসাব করা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পেয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস++ ব্যবহার করা হয়।
তবে বেতন নির্ধারণের সময় প্রযুক্তিগত জটিলতার পাশাপাশি গেজেটের কয়েকটি বিধান নিয়েও ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালের বেতনকাঠামো কার্যকরের পরও একই ধরনের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে সেই কমিটি জটিলতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এবার ছয় সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি বেতনকাঠামোর অসংগতি দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।