রবিবার থেকে পুরোদমে চালু হচ্ছে পোশাক কারখানা, কাটছে শ্রমিক অসন্তোষ

টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন বিঘ্নের পর দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগামী রবিবার (৮ নভেম্বর) থেকে অধিকাংশ কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে আশা করছেন শিল্পমালিকেরা। ওই দিন শ্রমিকদের অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধের কথা রয়েছে। বেতন পাওয়ার পর শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ আরও কমবে এবং কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে সাভার ও আশুলিয়ার ৮৮টি পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। আগের কয়েক দিনের তুলনায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সড়কে উত্তেজনাও কমেছে। তবে কিছু কারখানায় এখনো উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
শিল্পমালিকেরা জানান, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও জরুরি পণ্য সরবরাহের প্রয়োজন বিবেচনায় আশুলিয়ার ৮৮টি কারখানা খোলা রাখা হয়। শনিবার (৭ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে। এরপর রবিবার থেকে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কয়েক দিনের অস্থিরতায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন মালিকেরা। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দিতে শ্রমিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মপরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিল্পমালিকদের প্রত্যাশা, রবিবার অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধ করা হলে শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে। এতে কর্মবিরতি ও অসন্তোষের আশঙ্কা কমে উৎপাদন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালানো সম্ভব হবে।
আশুলিয়ার ৮৮ কারখানায় কাজে ফিরেছেন শ্রমিকেরা
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও জরুরি উৎপাদন ও শিপমেন্টের প্রয়োজনে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ৮৮টি পোশাক কারখানা চালু ছিল। সকাল থেকেই এসব কারখানায় শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দেন। শিল্পাঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল স্বাভাবিক।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ জানান, শুক্রবার সাধারণত কারখানাগুলো বন্ধ থাকে। তবে জরুরি উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের চাপ থাকলে কিছু কারখানা চালু রাখা হয়। সে অনুযায়ী শুক্রবারও ৮৮টি কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলেছে।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সকাল থেকে পুরো শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক রয়েছে। চালু থাকা কারখানাগুলোতে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, বৃহস্পতিবার থেকেই শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। মজুরি বোর্ড গঠন হওয়ায় শ্রমিকদের দাবিদাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে উৎপাদন সচল রাখা প্রয়োজন।
তবে শ্রমিকদের মধ্যে ভয় বা আতঙ্ক তৈরি হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি ও হয়রানির অভিযোগের মতো পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। কর্মস্থলে নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
১৩০ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গত বুধবার (৫ নভেম্বর) আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের প্রায় ১৩০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়ায় ৭০টি, গাজীপুরে প্রায় ৫০টি এবং নারায়ণগঞ্জে আটটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কিছু কারখানায় শ্রমিকেরা উপস্থিত হলেও কাজে যোগ দিতে রাজি হননি। কোথাও শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে। তবে আগের দিনের তুলনায় সড়ক অবরোধ, শ্রমিকদের জমায়েত ও ভাঙচুরের ঘটনা কমে আসে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে পোশাকশিল্প পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
মজুরি বোর্ড গঠনে কমছে অনিশ্চয়তা
পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মজুরি বৃদ্ধি। শ্রমিকেরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানুয়ারি থেকে নতুন কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে। মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে নতুন মজুরিকাঠামো চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা।
এদিকে কয়েক দিনের অস্থিরতায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশের পণ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে ক্রেতাদের আস্থা হারানো এবং ভবিষ্যতে নতুন কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকেরা।
সব মিলিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের চাপ কাটিয়ে পোশাকশিল্পে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শনিবারের ছুটির পর রবিবার বেতন পরিশোধ ও কারখানাগুলোতে নিয়মিত উৎপাদন শুরুর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এখন শ্রমিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাই শিল্পমালিকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।