দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহারে চোখ জ্বালাপোড়া করে কেন, সমাধান কী?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা, মেসেজের উত্তর দেওয়া কিংবা ভিডিও দেখা—দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়েছে। ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়েও অনেকেই দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করেন। কিন্তু একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা, খসখসে ভাব কিংবা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কারও কারও চোখ দিয়ে পানি পড়ে, চোখ লাল হয় বা সাময়িকভাবে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
এ ধরনের সমস্যার জন্য অনেকেই স্ক্রিনের আলো বা ব্লু লাইটকে দায়ী করেন। তবে এর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে ড্রাই আই বা চোখের শুষ্কতা। ডিজিটাল আই স্ট্রেইন ও ড্রাই আই—দুটি সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। তবে এগুলোর কারণ ও লক্ষণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ফোন ব্যবহারের পর চোখে জ্বালাপোড়া হয় কেন?
দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় চোখে অস্বস্তির অন্যতম কারণ হলো পলক ফেলার স্বাভাবিক হার কমে যাওয়া। স্ক্রিনে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকার সময় অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় কম পলক ফেলেন। ফলে চোখের উপরিভাগে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাধারণত একজন মানুষ প্রতি মিনিটে প্রায় ১৫ থেকে ২০ বার চোখের পলক ফেলেন। প্রতিবার পলক ফেলার সঙ্গে চোখের উপরিভাগে অশ্রু ও তেলের একটি পাতলা স্তর ছড়িয়ে পড়ে। এই স্তর চোখকে আর্দ্র ও সুরক্ষিত রাখে।
কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখলে পলক ফেলার হার অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে। অনেক সময় পলক পুরোপুরি না পড়ায় চোখের কিছু অংশ যথেষ্ট আর্দ্রতা পায় না। এতে অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং চোখে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা ও অস্বস্তি তৈরি হয়।
ঘরের ফ্যান বা এয়ারকন্ডিশনারের বাতাস সরাসরি চোখে লাগলেও সমস্যা বাড়তে পারে। কারণ এতে চোখের আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়।
ডিজিটাল আই স্ট্রেইন ও ড্রাই আইয়ের পার্থক্য
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর দুটি সমস্যাতেই চোখে অস্বস্তি হতে পারে। তবে লক্ষণগুলো আলাদা।
ডিজিটাল আই স্ট্রেইন: এটি কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম নামেও পরিচিত। দীর্ঘক্ষণ কাছের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ফোকাস করার কাজে চাপ পড়ে। এর ফলে দেখা দিতে পারে—
চোখ বা ভ্রুর চারপাশে হালকা ব্যথা;
চোখের পাতা ভারী বা ক্লান্ত লাগা;
মাথাব্যথা;
কোনো কিছুর ওপর দৃষ্টি স্থির রাখতে অসুবিধা;
বিশ্রামের পর কমে আসে এমন ঝাপসা দৃষ্টি।
ড্রাই আই বা চোখের শুষ্কতা: চোখ পর্যাপ্ত অশ্রু তৈরি করতে না পারলে কিংবা তৈরি হওয়া অশ্রু দ্রুত বাষ্পীভূত হলে এ সমস্যা দেখা দেয়। এর সাধারণ লক্ষণ—
চোখে জ্বালাপোড়া বা খোঁচা লাগার অনুভূতি;
চোখে কিছু আটকে আছে বা খসখসে লাগা;
চোখ লাল হওয়া ও অস্বস্তি;
চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি পড়া;
পলক ফেলার পর সাময়িকভাবে স্বাভাবিক হয়ে আসে এমন ঝাপসা দৃষ্টি।
দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে দুটি সমস্যাই দেখা দিতে পারে। কম পলক ফেলার ফলে চোখের আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়। অন্যদিকে, একটানা কাছের বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ফোকাস করার কাজে চাপ পড়ে।
অ্যালার্জি, চোখের পাতায় প্রদাহ, কন্টাক্ট লেন্সের ব্যবহার, ধুলাবালু এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও চোখের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে Ophthalmology and Therapy সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মার্টফোনের ব্লু লাইট কি চোখের ক্ষতি করে?
চোখে জ্বালাপোড়া ও স্ক্রিন ব্যবহারের পর অস্বস্তির জন্য প্রায়ই ব্লু লাইটকে দায়ী করা হয়। তবে সাধারণ স্মার্টফোন থেকে নির্গত নীল আলো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে—এমন দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বরং দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, স্বাভাবিকের তুলনায় কম পলক ফেলা এবং কাছের বস্তুর ওপর একটানা মনোযোগ ধরে রাখাই এ ধরনের অস্বস্তির বেশি পরিচিত কারণ।
স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমানো, আশপাশের আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা এবং সন্ধ্যায় নাইট মোড ব্যবহার করলে চোখের আরাম বাড়তে পারে। তবে ব্লু-লাইট ফিল্টার চোখের যত্নের বিকল্প নয়। নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং সঠিকভাবে স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।
স্ক্রিন ব্যবহারের পর চোখের অস্বস্তি কমাবেন যেভাবে
কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করলে চোখের ওপর চাপ কমানো এবং শুষ্কতা প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যায়।
২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলুন: প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান। এতে চোখের ফোকাস করার কাজে বিরতি মেলে।
সচেতনভাবে পলক ফেলুন: ফোনে পড়া বা স্ক্রল করার সময় নিয়মিত ও সম্পূর্ণভাবে পলক ফেলার চেষ্টা করুন। এতে চোখের উপরিভাগে অশ্রু সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ফোন চোখের স্তরের সামান্য নিচে রাখুন: ফোনের দিকে সামান্য নিচু হয়ে তাকালে চোখের কম অংশ উন্মুক্ত থাকে। এতে অশ্রু দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
সরাসরি বাতাস এড়িয়ে চলুন: ফ্যান বা এয়ারকন্ডিশনারের বাতাস সরাসরি মুখ ও চোখে লাগতে দেবেন না।
প্রয়োজনে লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করুন: কৃত্রিম অশ্রু বা লুব্রিকেটিং আই ড্রপ চোখের শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ঘন ঘন ব্যবহারের প্রয়োজন হলে প্রিজারভেটিভ-মুক্ত ড্রপ উপযুক্ত কি না, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
নিয়মিত বিরতি নিন: দীর্ঘ সময় একটানা ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার না করে মাঝেমধ্যে চোখকে বিশ্রাম দিন।
কখন চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?
স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়ার পর সাময়িক অস্বস্তি কমে গেলে সাধারণত তা ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা চোখের শুষ্কতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে বারবার চোখ জ্বালাপোড়া করা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তিকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহারের প্রয়োজন হলে, চোখের লালচে ভাব বা ব্যথা না কমলে কিংবা দৃষ্টি ঝাপসা থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। হঠাৎ দৃষ্টি কমে যাওয়া, তীব্র ব্যথা বা চোখে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।