এলডিসি উত্তরণে তিন বছরের ছাড়, ব্যতিক্রমী সংস্কার না হলে ক্ষুণ্ন হবে দেশের ভাবমূর্তি

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে দেখছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, জাতিসংঘের এই বিশেষ সিদ্ধান্তের মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশকে অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে দৃশ্যমান ও ব্যতিক্রমী সংস্কার করতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে সিপিডির কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ’স এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: দ্য ইউএনজিএ ডিসিশন অ্যান্ড আওয়ার অবজারভেশনস’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের প্রতি আস্থা রেখে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সম্মান রক্ষায় দেশকে ব্যতিক্রমী জাতীয় সাফল্য দেখাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিবকে চিঠি দিয়ে তিন বছরের মধ্যে নির্দিষ্ট পথরেখা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন। ফলে এই সময়ে সংস্কার না হলে তা প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ হবে এবং দেশের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত আসবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এখন শুধু পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় নয়; বরং বাস্তবে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সময়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের ওপর আস্থা রেখে যে বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষায় কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ২০১৮, ২০২১ ও ২০২৪ সালে এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত তিনটি সূচক পূরণ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট জটিলতা ও অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতভাবে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে।
তবে এই বাড়তি সময়ের সঙ্গে রয়েছে শর্ত ও নিয়মিত তদারকির বিষয়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) প্রতিবছর সরকারের দেওয়া প্রতিবেদন ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতটা সহায়তা করবে, তা নির্ভর করবে দেশের নিজস্ব সংস্কার কার্যক্রম এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ওপর।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো নীতিগত দলিল ও প্রতিশ্রুতি তৈরিতে দক্ষতা থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। মসৃণ উত্তরণ কৌশল বা স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) চূড়ান্ত করতেও ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময় লেগেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, মাঠপর্যায়ে কার্যকর পরিবর্তন নিশ্চিত করা জরুরি।
গবেষণাপত্রে দেশের অর্থনীতির কয়েকটি দুর্বলতার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। এ দুটি খাতে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি তৈরি কঠিন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ৮৮তম অবস্থানে থাকায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিশেষ সুবিধা, যেমন রপ্তানি নগদ সহায়তার বিকল্প ব্যবস্থাও ২০২৯ সালের নভেম্বরের আগেই গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
সফল উত্তরণ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে, মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্ব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পরিবর্তে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নেওয়া।
পাশাপাশি জাতীয় সংসদে উত্তরণ-সংক্রান্ত রোডম্যাপ উপস্থাপন এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য উন্মুক্ত ‘এসটিএস ড্যাশবোর্ড’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। সিপিডির মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার, সংসদ, গবেষক ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।