সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণের ছবি পোস্টে বাড়ছে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের সময় লোকেশন বা অবস্থানের তথ্য যুক্ত না করলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ছবিটি কোথায় তোলা হয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ছবির দৃশ্যমান বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে শহর ও দেশ শনাক্ত করতে পারছে আধুনিক এআই মডেলগুলো। এতে ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের মাধ্যমে অজান্তেই নিজের অবস্থান ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যাকাফি ল্যাবসের এক গবেষণায় ২১ হাজার ২৩৬টি প্রকাশ্য ভ্রমণসংক্রান্ত ছবি ব্যবহার করে দুটি এআই মডেলের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এতে গুগলের জেমা ৩ ২৭বি মডেল ৮৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ছবির শহর ও দেশ সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। অন্যদিকে, আলিবাবার কিউয়েন ৩ ভিএল ৩০বি মডেলের নির্ভুলতা ছিল ৯১ শতাংশ।
পরীক্ষায় ছবির জিপিএস তথ্য, এক্সিফ মেটাডেটা কিংবা ফাইলের নাম ব্যবহার করা হয়নি। বরং ছবিতে দৃশ্যমান উপাদান বিশ্লেষণ করে সেগুলো কোথায় তোলা হয়েছে, তা শনাক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মডেলগুলোকে।
ছবিতে থাকা ভবন ও অবকাঠামোর ধরন, দোকানের সাইনবোর্ড, রাস্তার চিহ্ন, গাছপালা, পাহাড়, সমুদ্রসৈকত কিংবা পরিচিত স্থাপনা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে এআই। এমনকি ছবিতে বিখ্যাত কোনো স্থাপনা না থাকলেও স্থানীয় স্থাপত্যশৈলী, আশপাশের পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্য থেকে শহর বা দেশ সম্পর্কে ধারণা করতে পারে প্রযুক্তিটি।
এর ফলে শুধু লোকেশন ট্যাগ বন্ধ রাখা বা ছবির মেটাডেটা মুছে ফেললেই ব্যক্তিগত অবস্থানের তথ্য পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ছবির দৃশ্যমান সূত্র থেকেই এআই সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করতে পারে।
ছবি থেকে প্রতারণার নতুন কৌশল
এআইয়ের এ সক্ষমতা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতারকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগিয়ে আরও বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং বার্তা তৈরি করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ ছুটিতে থাকা অবস্থায় ভ্রমণের ছবি প্রকাশ করলে প্রতারকেরা সেই তথ্য ব্যবহার করে তাঁর ব্যাংকের পরিচয়ে ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে। বার্তায় ভ্রমণের স্থান বা সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ থাকলে সেটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। এভাবে সাধারণ ছবি ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ কিংবা আর্থিক প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
ছবি প্রকাশে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে ভ্রমণের সময়ই ছবি প্রকাশ না করে বাড়ি ফেরার পর পোস্ট করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের দর্শক সীমিত রাখা এবং ছবি প্রকাশের আগে তাতে বাসা, কর্মস্থল বা নিয়মিত যাতায়াতের স্থান শনাক্ত করার মতো কোনো সূত্র রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
ছবির মেটাডেটা সরিয়ে ফেললে সেখানে সংরক্ষিত অবস্থানসংক্রান্ত কিছু তথ্য মুছে যেতে পারে। তবে এতে ছবির ভেতরে থাকা দৃশ্যমান সূত্রগুলো মুছে যায় না। তাই শুধু লোকেশন ট্যাগ বন্ধ করা বা মেটাডেটা সরানোর ওপর নির্ভর না করে ছবি প্রকাশের সময়ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কৌশলেও পরিবর্তন আনা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করলে নিজের অবস্থান, দৈনন্দিন চলাফেরা ও ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশের আশঙ্কা কমানো সম্ভব।