যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুতি কানাডার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুতি ও যুদ্ধের মডেল তৈরি করছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অবশ্য বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের ঝুঁকি খুবই কম এবং এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ায় সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়াকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন কার্নি। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ।
ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বিষয়ে তার বারবার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডা সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলার বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক মহড়া ও মডেল তৈরির কাজ করছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
২০২৫ সালে ট্রাম্পও বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত কম’। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তির পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ ব্যবহারের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
হোয়াইট হাউস বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, কানাডার জনগণের সুরক্ষায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি কেউ কিছু করেননি।
সামরিক বিশেষজ্ঞদেরও ধারণা, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলার সম্ভাবনা খুবই কম। দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তারপরও বিষয়টি কানাডীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর লেজার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন হামলার সম্ভাবনা কম
কানাডার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হবে—এমন পরিস্থিতি কল্পনা করা অত্যন্ত কঠিন এবং প্রায় অবাস্তব। ৩৪ বছরের সামরিক জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা হতে দেখেননি।
দুই দেশই নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো)-এর সদস্য। জোটের কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকার আকাশ ও মহাকাশ প্রতিরক্ষায় দুই দেশ নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড)-এর অধীনে যৌথভাবে কাজ করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে।
কোটসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় হামলা চালালে তা সরাসরি সামরিক আক্রমণ দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। সাইবার হামলার মতো তুলনামূলক গোপন ও অপ্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমে পরিস্থিতির সূচনা হতে পারে।
সবসময় এমন বন্ধুত্ব ছিল না
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়। অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও সংস্কৃতিতেও দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তবে ইতিহাসের সব পর্যায়ে তাদের সম্পর্ক এতটা ঘনিষ্ঠ ছিল না।
কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বলেন, ১৮ ও ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কানাডার জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
কানাডা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে হামলার চেষ্টা করেছিল। ১৭৭৫ সালে মার্কিন বাহিনী মন্ট্রিয়ল দখল করে এবং কুইবেক সিটি দখলের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
১৮১২ সালের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী তৎকালীন আপার কানাডা, লোয়ার কানাডা ও সামুদ্রিক উপনিবেশগুলোতে একাধিকবার হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়। ওই সংঘাতের সময় ব্রিটিশ বাহিনী ওয়াশিংটনে হামলা চালিয়ে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।
ফোরান বলেন, তখন পরবর্তীকালে কানাডায় পরিণত হওয়া উপনিবেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য গ্রেট ব্রিটেন ও রয়্যাল নেভির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও সামরিক নেতৃত্বে ভূমিকা রেখেছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাবের কারণে কানাডা সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে পরিকল্পনা শুরু করে। সে সময় কানাডীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পর্যটকের পরিচয়ে সীমান্তবর্তী মার্কিন শহরগুলোতে গিয়ে সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতেন।
কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চ বলেন, তখনও যুদ্ধের সম্ভাবনা কম ছিল। তবে সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সামরিক বাহিনীর স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ।
হামলা হলে কী হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও কানাডার সাম্প্রতিক প্রস্তুতিকে বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিট।
তার মতে, কানাডার নেতাদের এখন ভাবতে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তারা কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। কারণ দুই দেশের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের মাধ্যমে কানাডা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়, যা কোনো চরম পরিস্থিতিতে দেশটির বিরুদ্ধেও ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
শ্মিট বলেন, ট্রাম্পের কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বক্তব্য অনেক মার্কিন নাগরিক হয়তো গুরুত্ব দিয়ে নাও দেখতে পারেন। তবে কানাডীয়রা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন এবং প্রয়োজন হলে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি রাখছেন।
কানাডীয় সামরিক বাহিনীর একটি মডেলের বরাত দিয়ে গ্লোব অ্যান্ড মেইল চলতি বছরের শুরুতে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এরপর সংখ্যায় পিছিয়ে থাকা কানাডীয় বাহিনী গেরিলা ধরনের কৌশলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো মিত্রদের কাছে সহায়তা ও প্রতিরক্ষার আবেদন জানাতে পারে কানাডা।
তবে কোটসের মতে, এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিকল্পনার চেয়ে তুলনামূলক সীমিত পর্যায়ের একটি মডেল। তার ভাষ্য, স্থল হামলার মতো পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে—এ ধরনের পরিকল্পনা তৈরিতে কানাডা ন্যাটোর অন্য মিত্রদের তুলনায় পিছিয়ে ছিল। বর্তমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে দেশটি।
এদিকে কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান সম্প্রতি দেশটির সামরিক বাহিনীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ লাখ কম প্রশিক্ষিত নাগরিক সেনা যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।
তবে কানাডায় সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ হবে না বলে মনে করেন শ্মিট। তার মতে, কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ এলে মার্কিন সেনাবাহিনীর ভেতরেও ব্যাপক আপত্তি দেখা দিতে পারে। এমন নির্দেশকে কেউ কেউ অবৈধ বা অনৈতিক মনে করে পদত্যাগও করতে পারেন বলে তিনি ধারণা করেন।
কানাডীয় ও মার্কিন সেনারা নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণে অংশ নেয় এবং দুই বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা রয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক যুদ্ধের পর্যায়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তেল ও খনিজ সম্পদের মতো কৌশলগত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অকার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করেন শ্মিট।
তার মতে, এমন কোনো অভিযান চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো অভিযানের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি হলেও কানাডীয় বাহিনীও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন শ্মিট।