বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে মানুষের গল্প, লোডশেডিং নিয়ে আলোচিত সিনেমা

বিদ্যুৎ চলে গেলে দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ হঠাৎ বদলে যায়। গরমে অস্বস্তি, কাজকর্মে ব্যাঘাত, অন্ধকারে বসে থাকা কিংবা কখন বিদ্যুৎ আসবে সেই অপেক্ষা—লোডশেডিংয়ের সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। কিন্তু এই পরিচিত অভিজ্ঞতা যখন সিনেমার গল্পে উঠে আসে, তখন তা আর শুধু বিদ্যুৎ না থাকার গল্প থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের জীবন, সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি, প্রযুক্তিনির্ভরতা, ভয় এবং সংকটের সময় মানুষের আচরণের নানা দিক।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমায় বিদ্যুৎ-সংকট কখনো এসেছে ব্যঙ্গের বিষয় হয়ে, কখনো সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে, আবার কখনো বড় কোনো বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে। এমনই কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা নিয়ে এই আয়োজন।
ওরিদাথু
বিদ্যুৎকে ঘিরে নির্মিত উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রয়েছে মালয়ালাম ছবি ‘ওরিদাথু’। ১৯৮৭ সালে গোবিন্দন আরাভিন্দনের পরিচালনায় নির্মিত এই ব্যঙ্গাত্মক সিনেমার গল্প একটি প্রত্যন্ত গ্রামে প্রথমবার বিদ্যুৎ পৌঁছানোকে কেন্দ্র করে।
বিদ্যুৎ আসার আগে গ্রামের মানুষের জীবনযাপন যেমন ছিল, নতুন প্রযুক্তি আসার পর সেই জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আসে—হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। বিদ্যুৎকে শুধু আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং এর আগমন কীভাবে মানুষের সম্পর্ক, অভ্যাস ও সামাজিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আনে, সেটিও উঠে এসেছে।
ভারতের সরকারি চলচ্চিত্র আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, একটি গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর পর সেখানকার মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া পরিবর্তনই ছবিটির অন্যতম প্রধান বিষয়।
পাওয়ার কাট
বিদ্যুৎ-সংকট ও লোডশেডিংকে আরও সরাসরি ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছে ২০১২ সালের পাঞ্জাবি সিনেমা ‘পাওয়ার কাট’। জাসপাল ভাট্টির পরিচালনায় নির্মিত এই হাস্যরসাত্মক ছবির গল্পের পটভূমিতে রয়েছে ভারতের পাঞ্জাবে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সমস্যা।
বিদ্যুৎ-সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক নানা অনিয়ম নিয়েও ব্যঙ্গ করা হয়েছে সিনেমাটিতে। ফলে হাসির আড়ালে ছবিটি বিদ্যুৎব্যবস্থার নানা দুর্বলতার দিকও তুলে ধরে।
কাটিয়াবাজ
বিদ্যুৎ-সংকটের আরও বাস্তব ও কঠিন চিত্র দেখা যায় তথ্যচিত্র ‘কাটিয়াবাজ’-এ। ভারতের কানপুর শহরের দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ-সংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, বিদ্যুতের ঘাটতি কীভাবে অবৈধ সংযোগের একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করে।
তথ্যচিত্রটির অন্যতম চরিত্র লোহা সিং বিদ্যুৎ চুরি করে বিভিন্ন বাড়িতে সংযোগ দেওয়ার কাজ করেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ঋতু মহেশ্বরী অবৈধ সংযোগ বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্য দিয়ে ‘কাটিয়াবাজ’ শুধু বিদ্যুৎ চুরির গল্প বলে না; বরং দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হয়, সেই বাস্তবতাও সামনে আনে।
কানাভু ভারিয়াম
২০১৭ সালের তামিল সিনেমা ‘কানাভু ভারিয়াম’-এর গল্পও বিদ্যুৎ-সংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত। অরুণ চিদাম্বরম পরিচালিত ছবিটিতে তামিলনাড়ুর গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সমস্যা উঠে এসেছে।
এখানে বিদ্যুৎ শুধু গল্পের পটভূমি নয়, বরং কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গ্রামীণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও বাস্তবতার সঙ্গে বিদ্যুৎ-সংকট কীভাবে জড়িয়ে আছে, সেটিই ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ। সিনেমাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে এবং পুরস্কার পেয়েছে।
বাত্তি গুল মিটার চালু
বিদ্যুৎ-সংকট যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়, সেই দিকটি উঠে এসেছে ২০১৮ সালের হিন্দি সিনেমা ‘বাত্তি গুল মিটার চালু’-তে।
শ্রী নারায়ণ সিং পরিচালিত ছবিটির গল্পে বিদ্যুৎ-সংকটের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার নানা অনিয়মকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সেবার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অধিকার ও অর্থনৈতিক চাপের সম্পর্কও সিনেমাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দ্য ট্রিগার ইফেক্ট
লোডশেডিং বা বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় দীর্ঘস্থায়ী হলে একটি সমাজ কতটা অস্থির হয়ে উঠতে পারে, সেই অন্ধকার সম্ভাবনা দেখিয়েছে ১৯৯৬ সালের হলিউড সিনেমা ‘দ্য ট্রিগার ইফেক্ট’।
ডেভিড কোয়েপ পরিচালিত ছবিটিতে হঠাৎ বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও নগদ অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন জীবন কীভাবে অচল হয়ে পড়ে, তা দেখানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ না থাকার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে ভয় ও অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সামাজিক শৃঙ্খলাও দুর্বল হতে শুরু করে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সভ্যতার নিরাপত্তার আবরণ সরে গেলে মানুষের আচরণ কত দ্রুত বদলে যেতে পারে—সিনেমাটির মূল ভাবনায় সেই প্রশ্নই উঠে আসে।
নিশিযাপন
লোডশেডিং, বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চয়তার ভয়াবহতা দেখা যায় কলকাতার সিনেমা ‘নিশিযাপন’-এও। ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি পরিচালনা করেন সন্দীপ রায়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটির কাহিনি উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকার একটি নির্জন বাংলোয় বেড়াতে যাওয়া একটি পরিবারকে ঘিরে।
হঠাৎ ভূমিকম্পে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চারপাশ ডুবে যায় অন্ধকারে। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন পরিবারটি খাদ্যসংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে পড়ে। আর এই সংকটের মধ্যেই ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে মানুষের ভয়, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতা।
সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, দীপঙ্কর দে ও রাইমা সেনসহ অনেকে।
‘নিশিযাপন’ তাই শুধু দুর্যোগে আটকে পড়া কয়েকজন মানুষের গল্প নয়। বিদ্যুৎহীন একটি রাত, বিচ্ছিন্ন একটি পাহাড়ি বাংলো এবং চারপাশের অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি যেন একটি প্রশ্নই সামনে আনে—বাইরের আলো নিভে গেলে মানুষের ভেতরের অন্ধকার কতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে?
লোডশেডিং আমাদের কাছে হয়তো দৈনন্দিন জীবনের বিরক্তিকর একটি অভিজ্ঞতা। কিন্তু সিনেমার পর্দায় সেই অন্ধকার কখনো হয়ে ওঠে সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি, কখনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ, আবার কখনো মানুষের ভেতরের ভয় ও অস্থিরতা প্রকাশের মাধ্যম। তাই বিদ্যুৎহীনতার গল্প আসলে অনেক সময় মানুষের গল্পই হয়ে ওঠে।